শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
প্রযুক্তি

টুজি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাটন ফোন কী আর চলবে না?

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 06 নভেম্বর 2026, 08:22 সকাল • 3 বার পঠিত
টুজি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাটন ফোন কী আর চলবে না?

আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে টু-জি প্রযুক্তি বিদায় করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি প্রযুক্তি সমর্থিত বাটন ফোনে আর প্রচলিত মোবাইল কল করা যাবে না। তবে ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থন করে এমন বাটন ফোন সচল থাকবে।

তবে বিটিআরসির হিসাবে দেশে এখন ৬ কোটি ১৩ লাখ টুজি ফোন ব্যবহার করছেন গ্রাহকেরা, যেগুলোর বেশিরভাগই ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থন করে না।

ফলে নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে নতুন ফোন কিনতে হবে। তাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

গত অক্টোবরে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের একটি রোডম্যাপ তৈরি করে বিটিআরসি।

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন না দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর টু-জি ফোনের উৎপাদন এবং একই বছরের ৩০ জুনের পর এসব ফোনের বাজারজাতকরণ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সবশেষে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে রোডম্যাপে।

বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধ করে গ্রাহকদের আধুনিক নেটওয়ার্কে স্থানান্তর করা হবে। তবে এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থন করে না, এমন ফোনে প্রচলিত ভয়েস কল করা যাবে না। তবে ভোল্টি সমর্থিত বাটন ফোনে কল করা যাবে।

ভোল্টি (VoLTE) হচ্ছে ভয়েস ওভার লং টার্ম ইভোলিউশন। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে প্রচলিত টু-জি বা থ্রি-জি নেটওয়ার্কের পরিবর্তে ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভয়েস কল করা যায়।

অর্থাৎ, কোনো ফোনে ভোল্টি সুবিধা থাকলে সেটি ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো ইন্টারনেটভিত্তিক কলিং অ্যাপের প্রয়োজন হয় না।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “এখন গ্রাহকেরা নিজেরাই হোয়াটসঅ্যাপ বা এ ধরনের ওটিটি অ্যাপে শিফট করছেন। আবার ভোল্টিতেও কিছু মুভমেন্ট হচ্ছে।

“তবে টুজি সানসেট যদি হয়েও যায় তখন তো আর টুজি নেটওয়ার্ক থাকবে না। কিন্তু মানুষ তখনও মোবাইলে ফোন করতে পারবে। তখন সেটা হয় ওটিটি অ্যাপের মাধ্যমে কলটা যাবে অথবা ভোল্টি দিয়ে চলে যাবে। কথা কিন্তু মানুষ বলবে।”

তখন বাটন ফোন থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “এখনো কিন্তু কিছু ফোরজি ফোন পাওয়া যায় যেগুলো শুধু ভোল্টি ফোন।”

টেলিযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু টু-জি সমর্থিত বাটন ফোনগুলোই তখন অচল হয়ে পড়বে। কারণ, এসব ফোনে ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সক্ষমতা নেই।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, “অ্যাবসোলিউট টুজি হ্যান্ডসেটগুলো, যেগুলোর লাইফ সাইকেল তিন থেকে চার বছর, বিটিআরসি এই ফোন নির্মাতাদের নির্দেশনা দিয়েছে যে আগামী বছর থেকে আর কোনো টুজি হ্যান্ডসেট যাতে তৈরি না হয়।

“ফলে যেটা হবে, ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষের হাতে আর কোনো টুজি হ্যান্ডসেট থাকবে না। তখন সবই ফিচার ফোন হয়ে যাবে। তখন যদি আপনি ভয়েস কলে ডায়াল করেন, সেটা ভোল্টি দিয়ে চলে যাবে। অথবা অ্যাপ টু অ্যাপ কল যাবে। এখন পৃথিবীতে তাই হয়।

“যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এখন কোনো টুজি নেই। আপনি যদি ফোনে কল করেন তাহলে সেটা ভোল্টি দিয়ে চলে যায় অথবা অ্যাপ টু অ্যাপ কল যায়। এখনো ভোল্টি দিয়ে যাচ্ছে, আমরা বুঝতে পারছি না। টেকনোলজি চেইঞ্জ হয়ে যায়।”

সাহেদ আলম বলেন, “আপনি যদি ডেটা দিয়ে কল করেন তাহলে সেটা এক মিনিট ভয়েস কলের চেয়ে কয়েকগুণ সাশ্রয়ী হয়। আপনি নিশ্চয় জানেন কোনটা আপনার জন্য সাশ্রয়ী। সেজন্য তো মানুষ হোয়াটসঅ্যাপের মত অ্যাপগুলো ব্যবহার করছে।”

তবে অ্যাপের মাধ্যমে কল এবং ভোল্টি প্রযুক্তিতে কলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভোল্টি ব্যবহার করে সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা যায়। অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপের মত অ্যাপের মাধ্যমে কল করতে হলে দুই পক্ষেরই সংশ্লিষ্ট অ্যাপ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হয়।

সাশ্রয়ী ফোনের ব্যবস্থা কতটা

বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ব্যবহৃত টু-জি ফোনের বিকল্প কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, বাজারে এক হাজার টাকার কাছাকাছি দামেও বাটন ফোন পাওয়া যায়। অন্যদিকে স্মার্টফোনের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।

দেশের হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিম্ফনির স্বত্বাধিকারী এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা যুক্ত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেওয়া গেলে গ্রাহকদের মধ্যে ফোরজি ফোন ব্যবহারের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি কিস্তিতে হ্যান্ডসেট কেনার সুযোগও রাখা যেতে পারে।

তাতে টু-জি থেকে ফোরজিতে গ্রাহকদের স্থানান্তর ত্বরান্বিত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকেও কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভুঁঞা বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের প্রান্তিক মানুষের সংযোগ নিশ্চিত করতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্টফোনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

এ জন্য দেশে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে শুধু কম দামে স্মার্টফোন বাজারে আনলেই সব গ্রাহকের জন্য টু-জি থেকে ফোরজিতে যাওয়া সহজ হবে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে যারা মূলত ফোনে কথা বলা, রেডিও শোনা কিংবা টর্চ ব্যবহারের জন্য বাটন ফোন কেনেন, তাদের কাছে স্মার্টফোনের বাড়তি সুবিধার চেয়ে দামই বড় বিবেচ্য হতে পারে।

বর্তমানে বাজারে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে বাটন ফোন পাওয়া যায়। এসব ফোনে ভয়েস কলের পাশাপাশি টর্চ লাইট, মেমোরি কার্ড থেকে গান শোনা ও এফএম রেডিওর সুবিধা থাকে। কোনো কোনো ফোনে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত অনেক মানুষ স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাদের কাছে বাটন ফোনই সহজ ও পরিচিত মাধ্যম। বাটন ফোন বন্ধ হলে তাদেরও একটি অংশ কিছুটা সমস্যায় পড়তে পারেন।