বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানি ব্যবসায়ীদের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 28 অক্টোবর 2026, 11:30 দুপুর • 3 বার পঠিত
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানি ব্যবসায়ীদের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানি ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার টোকিওতে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) এ সংলাপ আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান আমাদের পাশে ছিল। এখন আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের সঙ্গে মিলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলুন, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করুন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এগিয়ে চলুন।

“আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট। আসুন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে পরিণত করি। আমাদের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি করি এবং আমাদের দুই মহান দেশের জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করি।”

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান–বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের যৌথ আয়োজনে জেট্রোর প্রধান কার্যালয়ে বিনিয়োগ ফোরামের এ সম্মেলন হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অংশীদারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জনগণের মধ্যে সম্পর্ক। প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নিতে জাপানে আসেন এবং মূল্যবান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তারা জাপানের দূত হিসেবে কাজ করেন এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন।

“আপনারা জেনে খুশি হবেন, আমরা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিচ্ছি। এটি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে চাই, যখন বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন ও বলতে পারবেন এবং বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্ক আরও গভীর করতে অবদান রাখবেন।”

জ্বালানি খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা পূরণে জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা চায় সরকার।”

প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ–জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে একটি উদ্ভাবনভিত্তিক প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়। জাপানি কোম্পানিগুলো তিনটি প্রধান উদ্বেগের কথা জানিয়েছে— নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা। আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি। এরই মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান করেছি। বাকি বিষয়গুলো সমাধানেও আমরা জোরালোভাবে কাজ করছি।

“আমি ভালোভাবেই বুঝি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিশ্চিয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন আস্থা। এ দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার দলের সদস্যরা বিনিয়োগবান্ধব যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আমরা এনেছি, সেগুলো তুলে ধরবেন।”

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করা। বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে আপনারা শুধু একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগই পাবেন না, বরং উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ ও সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন।

“জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ খুচরা বিক্রেতা, কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানিজ ইকোনমিক জোনে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সরকার তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য আমি জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা পূরণে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার এবং জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”

প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ একটি বাংলাদেশ–জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনভিত্তিক একটি আইটি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

“দুই দেশের মধ্যে মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহযোগিতারও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ তার মহাকাশ সক্ষমতা জোরদার করতে আগ্রহী। মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের উন্নত সক্ষমতা এবং ব্যাপক অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে জাপানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ আগ্রহী।”

উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য শহর ও গ্রামের মধ্যে, কারখানা ও বন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানুষকে সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনকে আরও কার্যকর করবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

“অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। তাই দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহযোগিতা চাই আমরা। পরবর্তী সময়ে সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাপানের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাব।”

প্রধানমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানের বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু বক্তব্য রাখেন।