রেকর্ড ভোটার উপস্থিতিতে গর্বিত ইসরাইলের আরবরা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
উত্তর ইসরাইলের একটি আরব শহরের গ্রন্থাগারকর্মী মাইসা নাসের কখনো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা ভাবেননি। কিন্তু কট্টর ডানপন্থী সরকারের কাছ থেকে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ হয়ে মঙ্গলবার জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন তিনি।
ইসরাইলের আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই তার মতো ক্ষোভ থেকে নজিরবিহীন সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাদের এই ক্ষোভ নির্বাচনে আরব আইনপ্রণেতাদের রেকর্ডসংখ্যক আসন এনে দিয়েছে। এখন বিরোধী দলগুলো আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে জোট গঠনে অনীহা কাটিয়ে উঠতে পারলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
নজিরবিহীন ভোটার উপস্থিতির পর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী নাসের। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনী প্রচারণার সবকিছুই অন্য রকম মনে হয়েছে। ঐক্য ছিল। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগের শেষ কয়েক ঘণ্টায় এমন এক ধরনের আনন্দ ছিল, যা আমরা আগে হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
হাইফার উত্তরে মাজদ আল-ক্রুম শহরের বাসিন্দা নাসের বলেন, ‘আমার বয়স ৫০ বছর। কিন্তু আমি সব সময় নির্বাচন বর্জন করেছি এবং বর্জনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছি। কারণ, নেসেটে (ইসরাইলের পার্লামেন্ট) নির্বাচিত সদস্যদের ওপর আমি গভীরভাবে হতাশ হয়েছিলাম।’
ইসরাইলের ১২০ আসনের নেসেটে আরব
আইনপ্রণেতারা প্রায় ১৯টি আসন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাজদ আল-ক্রুমের মতো শহরগুলোর ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি এ অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। শহরটিতে ভোট দেওয়ার যোগ্যদের ৮৫ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।
একসময় নির্বাচন বর্জনের প্রবণতা থাকা আরব সম্প্রদায় এখন ইহুদি ইসরাইলিদের তুলনায়ও বেশি হারে ভোট দিচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার পর থেকে দেশটিতে আরব ও ইহুদিদের মধ্যকার সামাজিক পরিবেশ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর যারা দেশ ছেড়ে যাননি, তাদের বংশধরদের একটি বড় অংশ এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের অনেকেই উত্তরের পার্বত্য গ্যালিলি অঞ্চলের শহর ও গ্রামগুলোতে বসবাস করেন।
নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও রয়েছেন। তারা গ্যালিলি অঞ্চলে ইহুদি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের আদলে সেখানে বসতি সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় প্রায়ই দায়মুক্তির অভিযোগ ওঠে।
‘এরপর কী হবে, জানি না’
গ্যালিলির নাজারেথসহ বিভিন্ন শহরে যাওয়ার মহাসড়কের পাশে প্রথমে হিব্রু ভাষার বিলবোর্ডে নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের ছবি দেখা যায়। পরে সেসব বিলবোর্ডের জায়গায় আরবি ভাষার পোস্টার চোখে পড়ে, যেখানে ভোটারদের আরব দলগুলোর তালিকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভোট দেওয়ার সময় মানুষের ভিড় দেখে অভিভূত হওয়ার কথা জানিয়ে আমাল ফারহান বলেন, ‘আমি নিজের জন্য গর্বিত, যারা ভোট দিয়েছেন তাদের সবার জন্যও গর্বিত। শুধু আমার শহরের মানুষের জন্য নয়, ভোট দেওয়া পুরো আরব সম্প্রদায়ের জন্যই আমি গর্বিত।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ১৮ বছর বয়সী ফারহান বলেন, ‘এই দেশে আমার অধিকার আমার সঙ্গে পড়াশোনা করা একজন ইহুদি শিক্ষার্থীর অধিকারের সমান হওয়া উচিত।’
প্রায় ১৫ হাজার মানুষের শহর মাজদ আল-ক্রুম একটি মহাসড়ক ও পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সেখানে তরুণ-বৃদ্ধ সবাই গভীর রাত পর্যন্ত আনন্দ-উৎসবে মেতে ছিলেন।
তবে পরদিনই রাজনৈতিক দর-কষাকষি ও আসন গণনার হিসাব শুরু হলে সেই আশাবাদের জায়গায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও বাবার পিৎজার দোকানের কর্মী মোহাম্মদ জারকাউই বলেন, ‘আমাদের আনন্দ-উল্লাসে অতিরিক্ত ভেসে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, এরপর কী হবে, তা আমরা জানি না।’
তিনি বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এই উদযাপন তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে, যখন সরকার পরিবর্তন হবে এবং এমন একটি সরকার আসবে, যারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।’
তার বাবা আহমদ বলেন, তিনি একটি আরব দলের পক্ষে ভোট দিলেও শহরের অনেক বাসিন্দা, এমনকি তার অন্য ছেলেও ইহুদি ইসরাইলি ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-কে ভোট দিয়েছেন।
আহমদ বলেন, ‘গোলান সত্যিই ইহুদি ও আরবদের মধ্যে শান্তি চান।’
গোলান বিরোধী দলের নেতা গাদি আইজেনকোটকে আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে নেতানিয়াহু সরকারের ‘বর্ণবাদী’ নীতির অবসান ঘটানো সম্ভব।
তবে বিরোধী দলের অন্য নেতারা আরব
আইনপ্রণেতাদের নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বারবার বলে আসছেন, সরকারে আরবদের অন্তর্ভুক্তি দেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।
‘আরবদের ইসরাইল থেকে বিতাড়িত করা হবে’
আরব সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা আশা করছেন, পরবর্তী সরকার তাদের এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গ্যাং-সহিংসতা মোকাবিলায় আরও বেশি সম্পদ বরাদ্দ করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন।
৮৩ বছর বয়সী অধিকারকর্মী মাহমুদ জিহন বলেন, ‘প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে। তারা এ নিয়ে কী করছে? কিছুই না।’
তিনি বলেন, মূলত বর্ণবাদী আচরণের আশঙ্কা থেকেই তিনি ভোট দিয়েছেন। তার ভয়, নেতানিয়াহুর সরকার ‘আরবদের ইসরাইল থেকে বিতাড়িত করবে’।
জিহন নতুন করে ‘নাকবা’র আশঙ্কা করছেন। আরবি ভাষায় ‘নাকবা’ অর্থ বিপর্যয়। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় কয়েক লাখ ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে এ নামে অভিহিত করা হয়।
যারা থেকে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকের জমি পরে বাজেয়াপ্ত করা হয়। মাজদ আল-ক্রুমের কাছে ইসরাইলি শহর গিলন ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় পরিবারের জলপাইবাগানের বড় অংশ হারানোর কথা স্মরণ করেন সামিহা শাবান।
তবুও নির্বাচনের রাতে আনন্দের ব্যতিক্রমী পরিবেশ দেখেছেন ৭৫ বছর বয়সী শাবান। তিনি বলেন, ‘গত ৩০ বা ৪০ বছরে আমরা এমন আনন্দ দেখিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর যদি আবার নির্বাচন হয়—কারণ আইজেনকোট ও জয়েন্ট লিস্টের মধ্যে সমঝোতা হয়নি—তাহলে আমরা আরও ভালো ফল পাব!’