বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার গঠনের অঙ্গীকার নেতানিয়াহু ও প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোটের

আতাউল্লাহ পলাশ • 28 অক্টোবর 2026, 07:30 সকাল • 5 বার পঠিত
ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার গঠনের অঙ্গীকার নেতানিয়াহু ও প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোটের

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট বুধবার সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছেন। তবে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় দেশটি গভীরভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির এ নির্বাচনে ভোটাররা নেতানিয়াহুর বিভাজনমূলক শাসনের বিষয়ে তাদের রায় দিয়েছেন। ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দেশটিকে আরও ডানপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন এবং হামাসের ওই হামলার জবাবে ধারাবাহিক যুদ্ধ শুরু করেছেন।

জেরুজালেম থেকে এএফপি জানায়, ভোট-পরবর্তী জরিপে দেখা গেছে, সাবেক সেনাপ্রধান ও রাজনীতিতে নবাগত আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এবং নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী শিবির প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে। তবে সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে উভয় জোটই অনেক দূরে রয়েছে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ায় ইসরাইলি আরব দলগুলো সবচেয়ে বেশি আসন অর্জনের আভাস পেয়েছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, সংখ্যালঘু আরব জনগোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ইসরাইলকে যে ইহুদি জাতীয়তাবাদী পথে তিনি পরিচালিত করছেন, তা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বুধবার রাত ৩টার পর জেরুজালেমের একটি সম্মেলনকেন্দ্রে উল্লসিত সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি ‘ডানপন্থীদের একটি শক্তিশালী সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘ইহুদি ও জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

৭৭ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী সাধারণ সময়ের তুলনায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং সরাসরি বিজয় দাবি করেননি।

এর পরিবর্তে তিনি তার নির্দেশে ইসরাইল যেসব নেতাকে হত্যা করেছে, তাঁদের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফায় বোমা হামলা চালানোর প্রস্তুতিরও ইঙ্গিত দেন।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলের সামনে ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে নির্মূল করার এক অনন্য সুযোগ রয়েছে।’

তেল আবিবে নিজের সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, নেতানিয়াহু জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য যুদ্ধকে কাজে লাগাতে পারেন।

আইজেনকোট বলেন, ‘নেতানিয়াহু, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরাইলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করার সাহস করবেন না।’

দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা নেতানিয়াহুর নয়, রাষ্ট্রের সেবা করেন। তিনি নেতানিয়াহুকে ‘জনসমর্থন ও জনগণের আস্থাবিহীন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী’ বলে অভিহিত করেন।

নিরাপত্তার বিষয়ে আইজেনকোটের অনেক মতামতের সঙ্গে নেতানিয়াহুর অবস্থানের মিল রয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে তিনি সমর্থন করেছেন, যে অভিযানে ভূখণ্ডটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

তবে আইজেনকোট ইসরাইলের অভ্যন্তরে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রায় বিনা শাস্তিতে হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনার অঙ্গীকার করেছেন।

১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ প্রায় ৭৮ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির পর আইজেনকোট বলেন, দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি দ্রুত সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

আইজেনকোট বলেন, ‘জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন যোগ্য নেতা জনগণের অনাস্থার রায় মেনে নিয়ে আজই রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিতেন।’

ইসরাইলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কের ভোট-পরবর্তী জরিপে উভয় জোটের জন্য প্রায় ৫১টি করে আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। প্রাথমিক জরিপগুলোতে অবশ্য বিরোধী জোট এগিয়ে ছিল।

ইসরাইলি আরব দলগুলো ১৭ থেকে ১৮টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের প্রায়ই অবমাননাকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে ইসরাইলের কয়েকটি আরব অধ্যুষিত এলাকায় প্রায় সর্বজনীন ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে।

ইসরাইলি আরবদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মানসুর আব্বাস বলেন, তাঁর বিশ্বাস, ডানপন্থীরা ‘বড় ধরনের পরাজয়ের’ মুখে পড়েছে। তিনি আইজেনকোটের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহও প্রকাশ করেন।

তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আইজেনকোট ইসরাইলি আরব আইনপ্রণেতাদের নিয়ে সরকার গঠন করবেন না বলে জানিয়েছিলেন। নেতানিয়াহুও আবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, আরবদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারের বৈধতা থাকবে না।

ইসরাইলি আরব আইনপ্রণেতারা জোট সরকারে যোগ না দিয়েও সংসদে বিভিন্ন ভোটাভুটিতে আইজেনকোটকে সমর্থন দিয়ে সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখতে পারেন। তা সম্ভব না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন হতে পারে।

কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন গভির, যিনি ভোট-পরবর্তী জরিপ অনুযায়ী প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পেয়েছেন, নেতানিয়াহুকে আরেকটি বিকল্পের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সেটি হলো আইজেনকোটের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।

ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বেন গভির বলেন, ‘এটি হবে ভয়াবহ ভুল।’ এমন কোনো ঐক্যের সরকার গঠিত হলে তাতে তাঁর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাত বলেন, বেন গভির ইসরাইলি আরবদের ভোটারদের সংগঠিত করতে সফল হয়েছেন।

তবে তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু হেরে গেলেও তার অর্থ এই নয় যে আইজেনকোট জিতে গেছেন।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা

ইরান যুদ্ধ, গাজায় সামরিক অভিযান, ইসরাইলি বসতি নির্মাণের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলো।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মামলাও চলছে। ক্ষমতা হারালে এসব মামলায় তার কারাদণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে, আইজেনকোট রাজনীতিতে নবাগত। তাঁর শান্ত ও সংযত আচরণ দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতানিয়াহুর সাবলীল বক্তৃতাশৈলীর সম্পূর্ণ বিপরীত।

মরক্কো থেকে আসা শ্রমজীবী ইহুদি অভিবাসীদের সন্তান আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তিনি ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবেন।

ভোট দেওয়ার আগে ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট গাজায় যুদ্ধে নিহত তার ছেলে গালের কবরের পাশে ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা জানান। ছেলের মৃত্যুতে ইসরাইলের বহু মানুষের সহমর্মিতা অর্জন করেছেন তিনি।

দেশটির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত এ নির্বাচনে অংশ নিতে বিদেশ থেকে কয়েক দশ হাজার ইসরাইলি দেশে ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

৫৫ বছর বয়সী ইলানা জিসব্লিট এএফপিকে বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে কানাডায় বসবাস করলেও আইজেনকোটের জোটের মধ্য-ডানপন্থী একটি দলকে ভোট দিতে তিনি দেশে ফিরেছেন।

তিনি বলেন, ‘দেশটি সত্যিই, সত্যিই খারাপ দিকে যাচ্ছে। দেশের ভেতরে বসবাসকারী ইহুদি ও আরব উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই, এমনকি বিদেশে বসবাসকারী ইহুদিদের জন্যও।’

তিনি বলেন, ‘এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। এখন ব্যবস্থা না নিলে দেশটি হয়তো আর টিকেই থাকতে পারবে না।’


#আন্তর্জাতিক #বাসস