সবরের রক্তিম অধ্যায়ে নারী সাহাবীদের অমর কীর্তি
ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় যাঁদের ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের রক্তিম রঙে চিত্রিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে নারী সাহাবীগণ (রাযি.)-এর ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয়। সবর বা ধৈর্য মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। সুখে-দুঃখে, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে এবং বিপদ-আপদে আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে অবিচল থাকাই প্রকৃত সবর।
শরিয়তের পরিভাষায় সবর মূলত তিন প্রকার:
১. সবর ‘আলাত তা‘আত: অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম পালনে ও ইবাদত-বন্দেগিতে অবিচল থাকা।
২. সবর ‘আলাল মা‘সিয়াত: অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানি ও পাপকাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
৩. সবর ‘আলাল মুসিবাত: অর্থাৎ বিপদ-আপদ ও কষ্টের মুহূর্তে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করা।
নারী সাহাবীগণ (রাযি.) তাঁদের জীবনের অসংখ্য ত্যাগ, কষ্ট, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অভাব-অনটন এবং কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সবরের এই তিনটি রূপেরই অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা মুসলিম নারীদের জন্য চিরন্তন আদর্শ।
তাঁদের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় ঈমানের পথে যত কঠিন পরীক্ষাই আসুক, একজন মুমিনা আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ভরসা রেখে ধৈর্য ধারণ করতে পারে। তাঁদের ত্যাগ, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস আমাদের জন্য শুধু ইতিহাসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিটি যুগের মুসলিম নারীর জন্য জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ধৈর্যশীলদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
"إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ"
নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান হিসাবহীনভাবে দেওয়া হবে। (সূরা যুমার আয়াত নং: ১০)
এই অটল ধৈর্য ও রবের সান্নিধ্যের কাঙ্ক্ষায় তাঁরা ইতিহাসের পাতায় অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন।
· সবরের তিন স্তরেই তাঁদের কীর্তি তুলে ধরা হলো
১. সবর ‘আলাত-তা‘আত
আল্লাহর হুকুম পালনে ও ইবাদত-বন্দেগিতে অবিচল থাকা
ঈমানের অনির্বাণ শিখা ও অটল অবিচলতা
ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া (রাযি.)। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে ইসলামের শত্রু আবু জেহেল তাঁকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে এবং উত্তপ্ত বালুকায় ফেলে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায়। কিন্তু এতসব নির্যাতনের মুখেও তাঁর মুখ থেকে ঈমানের কালিমা ও রবের নাম একটুর জন্যও মুছে যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করেন, যা ঈমানের ওপর অটল থাকার ইতিহাসের এক অমর দলিল।
ইসলামের সূচনা লগ্নে মক্কার মুশরিকদের অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল অনেক নারী সাহাবীদের। কুরাইশদের পাষাণ হৃদয়ের অত্যাচারও তাঁদের অন্তর থেকে আল্লাহর মহব্বত একটুও কমাতে পারেনি।
সন্তানের ঈমানের জন্য মায়ের ত্যাগ ও কুরবানি
নারী সাহাবীদের সবর ও ত্যাগের অন্যতম উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো, তাঁরা নিজেদের সন্তানদের দুনিয়াবি স্বাচ্ছন্দ্য বা জীবন বাঁচানোর চেয়ে ঈমান ও ইসলামের হেফাজতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। কুফর ও অন্ধকারের যুগে তাঁরা নিজ সন্তানদের বুকে আগলে রেখে ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন এবং প্রয়োজনে দ্বীনের পথে তাদের জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের ঈমান ও ধৈর্যের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন:
"وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ"
ধৈর্য-স্থৈর্যের সাথে নিজেকে সেই সকল লোকের সংসর্গে রাখ যারা সকাল ও সন্ধ্যায় নিজেদের প্রতিপালককে এ কারণে ডাকে যে, তারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। (সূরা আল-কাহফ, আয়াত নং: ২৮)
সন্তানের ঈমানের সুরক্ষায় মায়ের ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ, হযরত আসমা (রাযি.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাযি.) যখন উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে চরম সংকটে আমৃত্যু লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাঁর মা আসমা (রাযি.)-এর নিকট পরামর্শ চান। সেই বয়োবৃদ্ধ মা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন,
হে বৎস! যদি তুমি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, তবে মৃত্যুর ভয় কোরো না।
কারণ অন্যায়ভাবে জীবন বাঁচানোর চেয়ে মর্যাদার সাথে শাহাদাত বরণ করা অনেক শ্রেয়।
সন্তানের জাগতিক সুখের চেয়ে তার আখিরাত ও ঈমানের নিরাপত্তা রক্ষায় এই মায়েরা যে হিমালয়সম ধৈর্য ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা রবের সান্নিধ্য লাভের পথে নারী ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা ও হিজরতের আত্মত্যাগ
হিজরতের কঠিন সময়েও নারী সাহাবীগণ অসীম ত্যাগ ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি ও চেনা আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে সম্পূর্ণ অজানা ও বিপদাশঙ্কুল ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করেও তাঁরা এক মুহূর্তের জন্যেও আল্লাহর ওপর থেকে ভরসা হারাননি। তাঁদের কাছে দুনিয়াবি নিরাপত্তার চেয়ে ঈমানের হেফাজত ও আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল সবচেয়ে বেশি মূল্যবান।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহর ওপর ভরসাকারীদের পুরস্কার ঘোষণা করে ইরশাদ করা হয়েছে:
"وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ"
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। (সূরা আত-তালাক, আয়াত নং: ৩)
হযরত আসমা বিনত আবু বকর (রাযি.)-এর হিজরতের সময়কার ভূমিকা ছিল সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দলিল। চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও লোমহর্ষক পরিস্থিতিতেও তিনি রাতের আঁধারে মক্কার কাফিরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে “সাওর গুহায়” আত্মগোপনকারী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর পিতা হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও পানির ব্যবস্থা করে পৌঁছে দিতেন। গুহায় খাবার ঝোলানোর থলের মুখ বাঁধার জন্য তিনি নিজের কোমর থেকে ওড়নার বেল্ট বা ফিতা ছিঁড়ে দুই টুকরো করে ব্যবহার করেছিলেন। এই জন্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে “যাতুন নিতাকাইন” বা দুই ফিতাওয়ালা নারী উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ওপর শতভাগ ভরসা রেখে নারী সাহাবীগণ যে বীরত্ব ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মালের মোহত্যাগ ও হিজরতের কষ্টসাধ্য পথ
রবের সান্নিধ্য অর্জনে নারী সাহাবীগণ পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং জন্মভূমি ত্যাগের কঠিন পরীক্ষাও সফলভাবে উতরে গিয়েছিলেন। জীবনের সব আরাম-আয়েশ ও মালের মোহ বিসর্জন দিয়ে তাঁরা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
পবিত্র কুরআনে হিজরত ও ত্যাগের মহিমা ঘোষণা করে ইরশাদ করা হয়েছে:
"وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا لَنُبَوِّئَنَّهُمْ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً ۖ وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ أَكْبَرُ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ"
যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে হিজরত করেছে নিশ্চিত থেক আমি দুনিয়ায়ও তাদেরকে উত্তম নিবাস দান করব আর আখেরাতের প্রতিদান তো নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। হায়! তারা যদি জানত। (সূরা আন-নহল, আয়াত নং: ৪১)
হযরত উম্মে হাবীবা (রাযি.) ও হযরত আসমা বিনত আবু বকর (রাযি.)-এর মতো মহীয়সী নারীরা দ্বীনের খাতিরে হিজরতের দুর্গম পথ ও কঠিন প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছিলেন। হযরত উম্মে হাবীবা (রাযি.) স্বামী আবু হুদাইফার সাথে হাবশার অপরিচিত প্রবাসে চরম প্রতিকূলতার মাঝেও ঈমানের ওপর অবিচল ছিলেন। অন্যদিকে হযরত আসমা (রাযি.) মক্কার গুহায় আত্মগোপনকারী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে দিয়ে ‘যাতুন নিতাকাইন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
রবের সন্তুষ্টির আশায় পার্থিব বিত্ত-বৈভব ও জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে তাঁরা প্রতিটি বিপদকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন, যা ইতিহাসের পাতায় ত্যাগের এক অনন্য উজ্জ্বল নজির হয়ে আছে।
জিহাদের ময়দানে আত্মত্যাগ ও সেবা
রবের সান্নিধ্য অর্জনে নারী সাহাবীগণ কেবল ঘরসংসার সামলানো বা ঘরে বসে ইবাদত করার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং দ্বীনের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে জিহাদের ময়দানেও তাঁরা অতুলনীয় সাহস ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও তাঁরা সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে ইসলামি ইতিহাসের পাতায় বীরত্বের সোনালী অধ্যায রচনা করেছেন।
পবিত্র কুরআনে জিহাদ ও ময়দানে অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ"
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন দলের সম্মুখীন হবে, তখন অবিচলিত থাকবে এবং আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন কর। (সূরা আল-আনফাল, আয়াত নং: ৪৫)
ওহুদ ও খন্দকের মতো বিপজ্জনক যুদ্ধে হযরত নুসাইবা বিনত কা‘ব (উম্মে উমারা রাযি.) সরাসরি অস্ত্র হাতে ময়দানে নেমেছিলেন। কাফিররা যখন আকস্মিক হামলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল, তখন এই বীর নারী তরবারি ও ধনুক হাতে ঢাল হয়ে নবীজিকে রক্ষা করেছিলেন এবং নিজের শরীরে বহু মারাত্মক ক্ষত নিয়েও পিছপা হননি। এছাড়া হযরত রুফাইদা আসলামিয়া (রাযি.) ও অন্যান্য নারী সাহাবীগণ যুদ্ধাহত মুজাহিদদের সেবা করার জন্য ময়দানে তাঁবু গেড়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছিলেন। তাঁদের এই অসীম ধৈর্য, সেবা ও সাহসিকতা মুসলিম মুজাহিদদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে এক বিশাল মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছিল।
যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে নারী সাহাবীদের এই আত্মত্যাগ ও সেবা প্রমাণ করে যে, রবের সন্তুষ্টি অর্জনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও ছিল চিরস্মরণীয় ও অতুলনীয়।
২. সবর ‘আলাল-মা‘সিয়াত
আল্লাহর নাফরমানি ও পাপকাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা
নারী সাহাবীদের জীবন ছিল আল্লাহর আনুগত্য, ঈমানের দৃঢ়তা এবং নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁরা ঈমানের পথে কোনো বাধা, পার্থিব স্বার্থ বা প্রতিকূলতাকে আল্লাহর হুকুম থেকে সরে যাওয়ার কারণ হতে দেননি।
তাঁদের ত্যাগ, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস আমাদের জন্য শুধু ইতিহাসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিটি যুগের মুসলিম নারীর জন্য জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
৩. সবর ‘আলাল-মুসিবাত
বিপদ-আপদ ও কষ্টের মুহূর্তে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করা
প্রিয়জন হারিয়েও অটুট সবর
নারী সাহাবীদের জীবনে প্রিয়জন হারানোর বেদনা ছিল, কিন্তু সেই বেদনাও তাঁদের আল্লাহর প্রতি আস্থা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। হযরত উম্মু সালামাহ (রাযি.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর স্বামী হযরত আবূ সালামাহ (রাযি.) ইন্তিকাল করলে তিনি আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে নবী কারীম ﷺ-এর শেখানো দু‘আ পাঠ করেন,
اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
“হে আল্লাহ! আমার বিপদের কারণে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৯১৮)
উক্ত সবর ও দু’আর বরকতে পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মতো উত্তম জীবনসঙ্গীর নিয়ামত দান করেন।
এ ঘটনা শেখায়, মুমিনের জীবনে কোনো বিপদই আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণ নয়; বরং সবরের মাধ্যমে সেই বিপদই কল্যাণের দ্বার খুলে দিতে পারে। এবং তার থেকেও উত্তম নেয়ামত লাভ হয়।
মুসিবতে সবর: রবের সাথে নিভৃত সম্পর্ক
প্রিয়জন হারানোর বেদনা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার চরম মুহূর্তেও নারী সাহাবীগণ ধৈর্যের যে পাহাড় সমান দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন, তা মুমিন মাত্রই অনুকরণীয়।
সন্তানের ইন্তিকালের বেদনাতেও ঈমানের দৃঢ়তা
হযরত উম্মু সুলাইম (রাযি.)-এর জীবনে সবরের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাঁর ছোট্ট সন্তান অসুস্থ হয়ে ইন্তিকাল করলে তিনি তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখেন। এ সময় তাঁর স্বামী আবূ তলহা (রাযি.) সফরে ছিলেন। তিনি ফিরে এলে উম্মু সুলাইম (রাযি.) অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং স্বাভাবিক আচরণ করেন। আবূ তলহা (রাযি.) সন্তানের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি সরাসরি মৃত্যুর সংবাদ না দিয়ে হেকমতের সাথে বলেন, “সে এখন আগের চেয়ে শান্ত হয়েছে।” অর্থাৎ সরাসরি সংবাদ না দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন। এরপর তাঁদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও হয়। পরে তিনি স্বামীকে সন্তানের ইন্তিকালের সংবাদ জানান। এত মর্মান্তিক শোকের মধ্যেও তিনি হাহুতাশ না করে আল্লাহ তাআলার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থেকে সবর করেন।
পরদিন আবূ তলহা (রাযি.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বিষয়টি জানালে তিনি তাঁদের জন্য বরকতের দু‘আ করেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাঁদের আরেকটি সন্তান দান করেন এবং তাঁদের পরিবারে বিশেষ বরকত নাযিল করেন।
এ ঘটনা প্রমাণ করে সবর মানে দুঃখ অনুভব না করা নয়; বরং গভীর কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং নিজেকে সংযত রাখা।
স্বামীর বিপদে স্ত্রীর অটুট ধৈর্য ও সাহস জোগানো
সাহাবায়ে কেরামের পরিবারগুলোতে বিপদ-আপদ বা চরম সংকট নেমে এলে নারী সাহাবীগণ আতঙ্কিত বা দিশেহারা হয়ে পড়ার পরিবর্তে স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের ঈমান ও সাহস জোগাতেন। তাঁদের ধৈর্য ও সবর কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট সহ্য করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা পুরো পরিবারকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে উদ্বুদ্ধ করত। এভাবেই তাঁদের অটুট ধৈর্য পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা কঠিন বিপদে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
"وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ"
আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা তাদের কোনও মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, (“إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ”) আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত নং: ১৫৫ – ১৫৬)
স্বামীর বিপদে স্ত্রীর অতুলনীয় ধৈর্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হলেন হযরত আউফ ইবনে হারেস (রাযি.)-এর স্ত্রী কিংবা উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধের ময়দানে সাহাবী নারীদের ভূমিকা। যেমন, হযরত ফাতিমা (রাযি.) উহুদ যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে যখন দেখতে পেলেন তাঁর প্রিয় বাবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন এবং স্বামী হযরত আলী (রাযি.) লড়াই করে ফিরেছেন, তখন তিনি বিন্দুমাত্র ভেঙে না পড়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নবীজির ক্ষতস্থান পরিষ্কার করেছেন এবং রক্ত বন্ধ করতে পোড়ানো ছাই ব্যবহার করেছেন। এছাড়া বহু নারী সাহাবী যুদ্ধের ময়দানে নিজ স্বামী বা পরিবারের শাহাদাতের সংবাদ শোনার পরেও হাহুতাশ না করে রবের ফয়সালাকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে উল্টো অন্য মুজাহিদদের সান্ত্বনা ও সাহস জুগিয়েছেন।
স্বামীর বিপদে এই পাহাড়সম মানসিক শক্তি ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে নারী সাহাবীগণ প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন আদর্শ মুমিন নারী কেবল ঘরের শোভা নন, বরং বিপদের দিনে পরিবারের সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষ ও আত্মিক শক্তির উৎস।
অভাবের মাঝেও আল্লাহর ওপর আস্থা ও অল্পে তুষ্টি
মদীনার প্রাথমিক যুগে অনেক সাহাবী পরিবারকে চরম অভাব-অনটন ও উপবাসের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু নারী সাহাবীগণ বিলাসিতা ও পার্থিব চাহিদাকে কখনো জীবনের লক্ষ্য বানাননি। অল্পে তুষ্ট থাকা (কানাআত), স্বামীর সামর্থ্য ও সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু দাবি না করা এবং আল্লাহর দেওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিয়ামতের ওপরও শুকরিয়া আদায় করা ছিল তাঁদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। অভাবের দিনেও আল্লাহর ওপর তাঁদের এই অটুট আস্থা পার্থিব কষ্টকে ম্লান করে দিয়েছিল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা অভাবের মাঝেও সবরকারীদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন:
"وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ"
আর কত প্রাণী রয়েছে, যারা নিজেদের রিযিক বহন করে না; আল্লাহই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দান করেন। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত নং: ৬০)
অভাবের মাঝেও আল্লাহর ওপর আস্থার এক উজ্জ্বল প্রতীক হলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.)-সহ অন্যান্য আম্মাজানগণ। বহু দিন এমন যেত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘরে চুলোয় কোনো আগুন জ্বলেনি, শুধু খেজুর ও পানি খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। কিন্তু এরপরও তাঁদের মনে কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ ছিল না। একবার হযরত ফাতিমা (রাযি.) যাঁতাকলে গম ভাঙতে ভাঙতে হাতে ফোস্কা পড়ে যাওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে একজন খাদেম চাইতে এসেছিলেন। নবীজি (ﷺ) খাদেম না দিয়ে তাঁকে রাতে ঘুমানোর আগে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার তাসবিহগুলো পড়ার উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, এটি খাদেম পাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি কল্যাণকর। এই শিক্ষাকে ধারণ করে নারী সাহাবীগণ পার্থিব দারিদ্র্যকে হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন এবং রবের ওপর আস্থার চাদরে নিজেদের জীবন ঢেকে রেখেছিলেন।
অভাবের তাড়নায় অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করার এই মানসিকতা নারী সাহাবীদের আত্মাকে এতটাই সমৃদ্ধ করেছিল যে, দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।
বিপদে অশ্রু, কিন্তু অভিযোগ নয়: সবরের প্রকৃত রূপ
সবর বা ধৈর্য ধারণ করার অর্থ এই নয় যে, মানুষের হৃদয়ে কোনো কষ্ট বা বেদনা অনুভূত হবে না। প্রিয়জন হারালে বা কোনো মুসিবত আসলে মানুষের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানবীয় অনুভূতি। নারী সাহাবীগণের জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, প্রিয়জন হারালে বা কষ্ট-মুসিবতে তাঁদের চোখেও অশ্রু এসেছে, বিচ্ছেদে তাঁদের হৃদয়ও কেঁদেছে; কিন্তু তাঁরা কখনো আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা নাখোশ প্রকাশ করেননি। তাঁদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছে ঠিকই, কিন্তু রবের ওপর থেকে আস্থা কখনো ঝরেনি।
পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর ধৈর্যের উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
"وَتَوَلَّى عَنْهُمْ وَقَالَ يَا أَسَفَى عَلَى يُوسُفَ وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ"
আর তিনি তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন, ‘হায় ইউসুফ!’ এবং শোকে তাঁর উভয় চোখ অন্ধ হয়ে গেল, আর তিনি ছিলেন সংবরণকারী। (সূরা ইউসুফ, আয়াত নং: ৮৪)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরম প্রিয় কন্যা হযরত জয়নব (রাযি.) বা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সা‘দ ইবনে মুআয (রাযি.)-এর ইন্তেকালের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চোখ কিংবা উহুদের ময়দানে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় নারী সাহাবীদের চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরেছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর পুত্র ইব্রাহিমের মৃত্যুর সময় কেঁদেছিলেন এবং বলেছিলেন, "চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় বিদীর্ণ হয়, তবে আমরা কেবল সেটাই বলি যা আমাদের রবকে সন্তুষ্ট করে।" ঠিক একইভাবে নারী সাহাবীগণও মুসিবতের সময় নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছেন, কিন্তু মুখে কখনো ক্ষোভ বা রবের সিদ্ধান্তের ওপর বিন্দুমাত্র অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি।
চোখের জল আর অন্তরের দৃঢ়তার এই অপূর্ব সমন্বয়ই নারী সাহাবীদের চরিত্রকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল, যা মুমিন হৃদয়ের জন্য চিরকালের সান্ত্বনা ও ধৈর্যের দীপশিখা।
আজকের নারীদের জন্য অনুপম আদর্শ
আজকের সমাজে সামান্য দুঃখ-কষ্ট, মুসিবত, পারিবারিক অশান্তি, অভাব কিংবা দুঃখ অনেক সময় মানুষকে হতাশ করে তোলে। এমন সময়ে নারী সাহাবীদের (রাযি.) জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের মতো সবর, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি আস্থা অর্জন করতে পারলে কঠিন পরিস্থিতিও ঈমান বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
তাঁদের জীবন যেন বলে, কষ্ট জীবনকে শেষ করে না; বরং সবরের মাধ্যমে সেই কষ্টই বান্দাকে তার রবের আরও কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
উপসংহার: বর্তমান সমাজের জন্য শিক্ষা
নারী সাহাবীদের এই অনুপম ধৈর্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, জীবনের যেকোনো কঠিন বিপদে ও প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করাই হলো রবের সান্নিধ্য লাভের মূল চাবিকাঠি। পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার মোহ ছাপিয়ে তাঁরা যেভাবে একমাত্র রবের সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তা আমাদের যান্ত্রিক ও বস্তুবাদী জীবনে আত্মশুদ্ধির এক অনন্য প্রেরণা হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
সবরের প্রকৃত শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى
“প্রকৃত সবর তো প্রথম আঘাতের সময়ই।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৩০২)
নারী সাহাবীদের জীবনও এই হাদীসের বাস্তব ব্যাখ্যা। তাঁরা বিপদ আসার পর অভিযোগে ভেঙে পড়েননি; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে গেছেন। তাঁদের চোখে অশ্রু এসেছে, অন্তরে কষ্ট হয়েছে, কিন্তু সেই কষ্ট তাঁদের রবের প্রতি আস্থা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি।
আমাদের জন্য শিক্ষা
আজকের সময়ে সামান্য কষ্ট, পারিবারিক সমস্যা, অভাব কিংবা কোনো প্রাপ্তির ব্যর্থতাই অনেক সময় আমাদের ধৈর্য কেড়ে নেয়। অথচ সাহাবীদের জীবন আমাদের শেখায় কষ্ট আসবে, অশ্রু ঝরবে, হৃদয় ব্যথিত হবে; কিন্তু মুমিনের অন্তর আল্লাহর উপর আস্থা হারাবে না।
তাঁদের অনুপম সবর আমাদের শেখায় বিপদে অভিযোগের পরিবর্তে দু‘আ, হতাশার পরিবর্তে তাওয়াক্কুল এবং অস্থিরতার পরিবর্তে আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে।
পরিশেষ
নারী সাহাবীদের (রাযি.) জীবন ছিল সবর, ত্যাগ ও ঈমানের জীবন্ত পাঠশালা। তাঁরা দেখিয়ে গেছেন সবর মানে কেবল কষ্ট সহ্য করা নয়; বরং কষ্টের মাঝেও আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর প্রতিদানের আশায় অবিচল থাকা।
তাঁদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
বিপদ যত কঠিনই হোক, যে হৃদয় আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, সে হৃদয় কখনো পরাজিত হয় না।