‘সাম্পানে খুন করে স্ত্রীর লাশ খালে ফেলে দেন স্বামী’
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন স্বামী; তা মেনে না নেওয়ায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়।
সেই অনুযায়ী বেড়ানোর কথা বলে সাম্পানে তুলে খুন করা হয়। এরপর লাশ বস্তাবন্দি করে খালে ফেলেন স্বামী।
মাস তিনেক আগে চট্টগ্রামের শিকলবাহা খালে এ খুনের ঘটনা ঘটে। তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুনের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনো অধরা খুন হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসের স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু।
বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের চট্টগ্রাম মেট্রোর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
নিহত ২৮ বছর বয়সি জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকুপ ইউনিয়নের মনকি চর দীঘির পাড় গ্রামের নুরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি চান্দগাঁও এলাকার ম্যাপ সুজ লিমিটেড নামের জুতার কারখানায় কাজ করতেন।
নগরীর চান্দগাঁও বাহির সিগন্যাল এলাকায় বেপারি পাড়া নাছির উদ্দিনের ভাড়া ঘরে দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু ও সাত বছর বয়সি মেয়েকে নিয়ে থাকতেন।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর এসআই আব্দুর রহিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন বছর আগে প্রথম স্বামীর সাথে জান্নাতুলের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি রাজুকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় রাজু নিজে অবিবাহিত বলে জানিয়েছিল।”
রাজু শপিং ব্যাগ তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের কাজ করতেন। রাজুর প্রথম স্ত্রী রুবি আক্তার নগরীর কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা এলাকায় নিজ বাড়িতে থাকতেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “বিয়ের কিছুদিন পরেই জান্নাতুল তার স্বামী রাজুর প্রথম বিয়ের কথা জেনে যায়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এতে রাজা বিরক্ত হয়ে জান্নাতুলকে খুনের পরিকল্পনা করে ও পূর্ব পরিচিত মো. মুসলিম উদ্দিনের সাথে পরামর্শ করে।
“এর মধ্যে মুসলিম উদ্দিনকে নিয়ে কালুরঘাট সেতু এলাকার একজন কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুক ও বিভিন্ন তান্ত্রিকতার আশ্রয় নেয়। কবিরাজি পন্থায় বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় রাজা মিয়া জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।”
পুলিশ জানায়, চলতি বছরের ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় রাজু তার দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যায়।
সেখানে আগে থেকে মুসলিম উদ্দিন, আরেক ব্যক্তি এবং রাজুর প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ নিজের সাম্পান নিয়ে ঘাটে অপেক্ষায় ছিলেন।
নদীতে ঘোরার কথা বলে জান্নাতুলকে সাম্পানে তুলে নিয়ে কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে নৌকা।
ইঞ্জিন চালিত সাম্পানটি মুসলিম উদ্দিন চালাচ্ছিলেন এবং শুকুর নৌকার পানি সেচছিলেন। রাত ৮টার পর রাজু জান্নাতুলের সাথে ঝগড়ায় জড়িয়ে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেয়।
পিবিআই কর্মকর্তা এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “এরপর রাজু জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরে এবং আরেকজন নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করে রশি দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে।
“কিছুক্ষণের মধ্যে জান্নাতুল মারা গেলে রাজু ও অন্য এক আসামি মিলে তার হাত ও পা রশি দিয়ে বেঁধে লাশটি বস্তাবন্দি করে কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকার এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছন বরাবর অংশে শিকলবাহা খালে ফেলে দেয়।”
পরে নৌকা নিয়ে আবার ব্রিজঘাটে ফিরে আসেন রাজু ও তার সহযোগীরা। এরপর যে যার মত চলে যান।
গত ২ অগাস্ট নগরীর কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে লঞ্চঘাট লাগোয়া শিকলবাহা খালে বস্তাবন্দি হাত-পা বাঁধা লাশটি ভাসমান অবস্থায় পেয়ে উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ থানা পুলিশ।
এর পরদিন জান্নাতুলের পরিবার তার লাশ শনাক্ত করে। তারা রাজুকে সন্দেহ করে। কারণ তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল।
জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজু এবং অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন লাশ উদ্ধারের পরদিন।
পরে পিবিআই ৬ অক্টোবর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায়।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর এসআই আব্দুর রহিম জানান, তথ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ থানা এলাকায় আশ্রয় নেয়া আসামি মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
“তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরেক আসামি শুকুর আহম্মদকে গ্রেপ্তার ও সাম্পানটি জব্দ করি। মুসলিম উদ্দিনকে আদালতে হাজির করা হলে ১৪ অক্টোবর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।”
জান্নাতুলের স্বামী রাজুকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে জানিয়ে পিবিআই কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, “অন্য একজন আসামির নাম-পরিচয় জানা থাকলেও তদন্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করছি না।”