শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

মুসলিম মনীষীদের অন্তরে খ্যাতির ভয়

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 07 এপ্রিল 2026, 09:46 সকাল 76 বার পঠিত
মুসলিম মনীষীদের অন্তরে খ্যাতির ভয়

ইসলামে খ্যাতির মোহ নিষিদ্ধ। খ্যাতির মোহের কারণে পরকালে মানুষের বহু আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে। পূর্বসূরী মহান আলেমরা সব সময় খ্যাতি বা প্রচারকে ভয়ের দৃষ্টিতে দেখতেন।

কোরআন ও হাদিসে আলোকে খ্যাতির মোহ নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে সেসব নামাজি ব্যক্তির নিন্দা করা হয়েছে যারা লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করে অর্থাত্ যাদের অন্তরে সুনামের আকাঙ্ক্ষা থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ সেই নামাজ আদায়কারীদের, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে।’ (সুরা মাউন, আয়াত : ৪-৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেওয়া হলে পরে তা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন করে তার দ্বিনদারির।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৬)

খ্যাতির মোহ নিষিদ্ধ কেন

অন্তরে খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা পোষণ করার ক্ষতিকর অনেক দিক আছে। এর প্রধান দিক হচ্ছে দুনিয়া ও আখেরাতে ইবাদত নিষ্ফল হয়ে যাওয়া। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লেখেন, ‘অন্তরের গোপন আকাঙ্ক্ষাগুলো আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা ধ্বংস করে, দ্বিনদারির ক্ষেত্রে তাঁর ইখলাস বা নিষ্ঠা ধ্বংস করে। এজন্য শাদ্দাদ ইবনু আউস (রহ.) বলেছেন, হে আরব সন্তানরা! আমি তোমাদের ব্যাপারে প্রদর্শনপ্রিয়তা ও গোপন আকাঙ্ক্ষার মতো অন্য কোনো কিছুর ভয় করি না।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : ১০/২১৪)

বিখ্যাত সুফি সাধক বিশর হাফি (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি খ্যাতি লাভের আকাঙ্ক্ষা রাখে তাঁর দ্বিনদারি ধ্বংস হয় এবং সে লাঞ্ছিত হয়। এমন ব্যক্তি ইবাদতের স্বাদ পায় না।’ (ইতহাফু সাদাতুল মুত্তাকিন : ১০/১২)

আলেমদের অন্তরে খ্যাতির ভয়

আল্লাহপ্রেমীরা সব সময় খ্যাতির মোহ ও সুনামের আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে থাকতেন। তাদের অন্তরে খ্যাতির ব্যাপারে সর্বদা ভয় কাজ করত। তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখতেন যেন তাদের সুনাম ছড়িয়ে না পড়ে। নিম্নে এমন কয়েকজন আলেমের বিবরণ দেওয়া হলো। 

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) : হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, একবার আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাঁর ঘর থেকে বের হলেন। মানুষ তার পিছু নিল। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন, আমার অনুসরণ করছ কেন? আল্লাহর কসম! তোমরা যদি জানতে ঘরের দরজা আমার কতকিছু আড়াল করেছে, তবে তোমাদের মধ্য থেকে দুইজনও আমার অনুসরণ করতে না। অর্থাত্ তিনি খ্যাতির ভয়ে মানুষকে নিজের ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করছিলেন। (ইতহাফু সাদাতুল মুত্তাকিন : ১০/১১)

২. ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) : বিশিষ্ট বুজুর্গ ও সুফি সাধক ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্তরে খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা রাখে, আল্লাহ (নিজের ভালোবাসা ও ইবাদতের ব্যাপারে) তাঁকে সত্যবাদী হিসেবে গ্রহণ করেন না।’ (সালাহুল উম্মাতি ফি উলুয়্যিল হিম্মাতি : ১০/১২৬)

৩. ইবনু মুহাইরিজ (রহ.) : এক ব্যক্তি এই মহান বুজুর্গের সঙ্গে সফর করে। বাড়ি ফেরার সময় তিনি তাঁকে বলেন, আমাকে উপদেশ দিন। ইবনু মুহাইরিজ (রহ.) তাঁকে বলেন, ‘সম্ভব হলে, তুমি মানুষকে চিনবে, নিজেকে চেনাবে না; তুমি অন্যের কাছে যাবে, অন্যকে তোমার কাছে আসতে বাধ্য করবে না; তুমি অন্যের কাছে জিজ্ঞাসা করবে, নিজে জিজ্ঞাসিত হবে না।’ (শরহু শিরআতিল ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩০৯)

৪. খালিদ ইবনে মাদান (রহ.) : বিখ্যাত তাবেয়ি ও আবেদ খালিদ ইবনে মাদান (রহ.)-এর মজলিসে জনসমাগম বৃদ্ধি পেলে তিনি মজলিস ত্যাগ করে চলে যেতেন। কেননা তিনি ভয় পেতেন জনসমাগমের কারণে মানুষের ভেতর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে পারে। (আন-নিয়্যাতু ওয়াল ইখলাস, পৃষ্ঠা-১২৫)

এই ব্যাধির চিকিত্সা আবশ্যক

আলেমরা বলেন, খ্যাতির মোহ ও আকাঙ্ক্ষা একটি আত্মিক ব্যাধি, মুমিনের উচিত এই ব্যাধির চিকিত্সা করা। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালি (রহ.) লেখেন, ‘খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা বা ভালোবাসা একটি ধ্বংসাত্মক বিষয়। এর প্রতিকার করা এবং অন্তর থেকে তা দূর করা আবশ্যক। যে ব্যক্তি পরকালীন জীবনের মর্ম বোঝে তার কাছে খ্যাতি তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হয়।...মুমিন খ্যাতিমান ব্যক্তির বিপদগুলো নিয়ে চিন্তা করে। তা হলো, প্রত্যেক খ্যাতিমান ব্যক্তি ঈর্ষার পাত্র, ক্ষতির লক্ষ্যবস্তু, বিখ্যাত ব্যক্তি নিজের মর্যাদার জন্য সর্বদা ভীত এবং মানুষের অন্তরে তার অবস্থান বদলে যাওয়ার শঙ্কায় শঙ্কিত।’ (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন : ৩/৪৫৩)