শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
নবী-রাসূল

কাফেরদের যবানে নবীজির জীবন

ড. মো: সাইফুল ইসলাম • 25 সেপ্টেম্বর 2026, 12:03 রাত • 3 বার পঠিত
কাফেরদের যবানে নবীজির জীবন

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَسَنَدَنَا وَحَبِيبَنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، صَلَّى اللَّهُ تَعَالَى عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارَكَ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا كَثِيرًا.

أَمَّا بَعْدُ: فَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا. وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "أَسْلِمْ تَسْلَمْ"

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

ভূমিকা

আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাআলার দরবারে দিল থেকে শুকরিয়া আদায় করছি যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে জুমার সালাত আদায় করার জন্য তাঁর ঘর মসজিদে আসার তৌফিক দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

সহিহ বুখারী শরীফের যে হাদিস ছয় নম্বরে আসছে, সেই হাদিস থেকে অল্প কিছু অংশ আপনাদের সামনে পাঠ করেছি এবং ২২ পারার ২ নম্বর পৃষ্ঠার সূরা আহযাবের ৪০ নং আয়াত আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি।

সহিহ বুখারী শরীফের এই ছয় নম্বর হাদিস—এটি বুখারী শরীফের শুরুর দিকে যত হাদিস আছে, তার মধ্যে অনেক লম্বা হাদিস। যারা ওলামায়ে কেরাম আছেন তারা জানেন যে, বুখারী শরীফ যখন মাদ্রাসায় পড়ানো হয়, এই হাদিসের ব্যাখ্যার পিছনে অর্থাৎ ছয় নম্বর হাদিসের ব্যাখ্যার পিছনে কখনো কখনো এক সপ্তাহ সময় লাগে! এত লম্বা সময় এই হাদিসের প্রতিটা শব্দ নিয়ে, প্রতিটা ব্যাখ্যা নিয়ে, প্রতিটা বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে যে, সহীহ বুখারী শরীফের যারা ব্যাখ্যা লিখেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এই এক হাদিসের ব্যাখ্যা লেখতে গিয়ে শত শত পৃষ্ঠা পার করে ফেলেছেন।

এজন্য ছয় নম্বর হাদিসের মধ্যে কি আছে—এর বিস্তারিত আলোচনা করার সময় নেই, কিন্তু একটা ধারণা দেওয়ার জন্য আপনাদের সামনে হাদিসের কিছু অংশ বাংলায় বলার নিয়ত করেছি।

রোম সম্রাটের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও পত্র প্রেরণ

মূলত এই ছয় নম্বর হাদিসের মধ্যে আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার মাত্র চার বছর আগে এক বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল। সেই পুরা ঘটনা ছয় নম্বর হাদিসে লেখা নেই, পুরা ঘটনা অন্যান্য কিতাবের মধ্যে আছে; কিন্তু সেই ঘটনার কিছু অংশ এই ছয় নম্বর হাদিসের মধ্যে ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিয়ে আসছেন।

আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের চার বছর আগে নবীজির মনে একটা ইচ্ছা জাগ্রত হলো যে, "আমি তো মদিনা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারছি না, ইসলামের দাওয়াত তো সারা দুনিয়ায় পৌঁছানো দরকার।" ইসলামের এই সংবাদ এটা তো শুধু মক্কা-মদিনার জন্য না, এটা সারা দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়া দরকার। কীভাবে পৌঁছানো যায়? তো এই দাওয়াত পৌঁছানোর অনেক সূরত সামনে আসল। তার মধ্যে একটি বিষয় ছিল—ইতালি, পর্তুগাল, ফ্রান্স ওই পুরা এলাকাকে একটি নামে নাম দেওয়া হইতো, যেই নাম ছিল 'রোম'। ২১ পারায় একটি সূরা আছে, সূরা আর-রূম। ওই এলাকায় একটি ঘটনা ঘটছিল, সেই ঘটনার জন্য আল্লাহ তাআলা ২১ পারায় একটি সূরা নাযিল করেছেন, 'সূরা রূম'। আর বর্তমান ইতালির রাজধানীর নামও রোম। তার মানে আগে রোম পুরা এলাকাকে বলা হতো, যেমন আমাদের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল—এই পুরা অঞ্চলকে একসময় বলা হতো 'হিন্দ'। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে ভাগ হয়ে হয়ে একেক দেশের একেক নাম হয়ে গেছে।

তো সেই রোমের যে বাদশা ছিল, সেই বাদশার নাম ছিল বাদশাহ হিরাকল (যাকে বাংলায় ইতিহাসে লেখা হয় হেরাক্লিয়াস)। সেই রোমের বাদশা এত বিশাল বাদশা! আমাদের নবীজি মদিনা থেকে চাইলেন যে, ওই রোমের বাদশার কাছে ইসলামের দাওয়াত আমি পৌঁছাব। এখন কীভাবে পৌঁছাবেন?

আমাদের নবীজির এক সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম ছিল হযরত দিহ্‌ইয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। এই সাহাবী এত সুন্দর সাহাবী ছিলেন যে, অনেক সময় পুরুষ মানুষরাও তাঁকে দেখলে মনে করত মহিলা মানুষ! এত চমৎকার চেহারা আল্লাহ তাআলা এই সাহাবীকে দান করেছিলেন। হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যদি আসল আকৃতি নিয়ে সবসময় আমাদের নবীজির সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসতেন, তাহলে আমাদের নবীজি সইতে পারতেন না। জিবরাঈল আলাইহিস সালামের আসল আকৃতি এত বড় ছিল যে, হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, আমাদের নবীজির সারা জীবনে মাত্র তিনবার জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তাঁর আসল আকৃতি প্রকাশ করছেন; আর সবসময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মানুষের বেশ ধরে আমাদের নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন। কার বেশ ধরে আসতেন? ওই দিহ্‌ইয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বেশ ধরেই জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন।

তো নবীজি এই সাহাবীকে নির্বাচন করলেন—"দিহ্‌ইয়া! তোমার কাছে আমি চিঠি দিব, তুমি এই চিঠিটা নিয়ে সেই রোমে চলে যাবা। মদিনা থেকে রোমে চলে যাবা, ইতালির ওই এলাকায় চলে যাবা। সেদিকে গিয়ে ওই বাদশার কাছে গিয়ে এই চিঠিটাকে তুমি পৌঁছিয়ে দিবে।"

রোম সম্রাটের স্বপ্ন ও আরবের লোকের সন্ধান

হযরত দিহ্‌ইয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমাদের নবীজির এই চিঠি হাতে নিয়ে রওনা হয়ে গেছেন। এদিক দিয়ে উনি রওনা হইছেন, ওদিক দিয়ে রোমে আরেক ঘটনা ঘটে গেছে!

রোমের বাদশা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পরে তার মনটা কালো হয়ে আছে, চেহারা কালো, বড় টেনশন। আশেপাশের যারা উজির-নাজির আছে, তারা বলতে শুরু করল, "বাদশা! আপনি কি কারণে এত মন খারাপ? আপনার সমস্যা কি?"

তখন বাদশা জবাব দিল যে, "আজকে রাতের বেলা যারা জ্যোতিষী আছে, তারা আমাকে একটা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ব্যাখ্যা হলো—এক জাতি, যেই জাতির অভ্যাস হলো তারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে কেটে ফেলে, মানে মুসলমানি করে, খতনা করে। ‘মালিকুল খিতান’—অর্থাৎ যেই জাতিরা খতনা করে, যারা নিজেদের লজ্জাস্থান কাটে, এরকম স্বভাব যেই জাতির মধ্যে আছে, ওই জাতি আস্তে আস্তে অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং কিছুদিনের মধ্যে তারা আমার এই রাজপ্রাসাদ দখল করে ফেলবে! এটা আমার কাছে জ্যোতিষীরা সংবাদ দিল। এখন আমার বের করা দরকার—কারা এই মুসলমানির অভ্যাস আছে, কাদের মধ্যে খতনা করার অভ্যাস আছে, এটা আমার জানা দরকার।"

তখন ওই সময় এক ঘটনা ঘটল। উনি এই কথাবার্তা বলতেছেন, এই বলা অবস্থায় লোকজন এক লোককে ধরে নিয়ে আসছে বাদশার কাছে যে, "এই দেখেন বাদশা, উনি কি যেন কথাবার্তা বলে যে, মদিনায় নাকি একজন লোক আসছে, যেই লোক বর্তমানে নবী! আপনার চাইতেও নাকি তার মর্যাদা অনেক বেশি! এরকম কথাবার্তা এই লোক বলে।"

বাদশা বলতেছে, "একে পাশের রুমে নিয়ে যাও। নিয়ে গিয়ে দেখো যে, এর খতনা করা আছে কিনা।" তখন গিয়ে দেখা গেল তার খতনা করা আছে। তখন বাদশা তাকে জিজ্ঞেস করল যে, "তোমার খতনা করা আছে, তার মানে তোমার দলের কোনো নেতার বিষয়ে কোনো ঘটনা ঘটছে। আমি ওই নেতা সম্পর্কে কিছু কথাবার্তা জানতে চাই, কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আমি কোথায় পাব ওই নেতা সম্পর্কে জানার জন্য?"

তখন সেই লোকটা পরামর্শ দিল যে, "নেতা সম্পর্কে যদি আপনার কিছু জানতে হয়, তাহলে আপনার এলাকার মধ্যে আপনি খবর পাঠান, দেখেন ওই মদিনা এলাকা বা মক্কা এলাকার কোনো লোক এই এলাকায় আছে কিনা।"

আবু সুফিয়ান ও সম্রাট হিরাকলের ঐতিহাসিক প্রশ্নোত্তর

ঠিকই বাদশা সাথে সাথে খবর পাঠাইলেন। খবর পাঠানোর পরে পাওয়া গেল—তৎকালীন সময়ের কাফেরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কাফের, তার নাম ছিল আবু সুফিয়ান। আবু জাহেল, আবু লাহাব এদের পরে যেই লোক সবচেয়ে বেশি আমাদের নবীজির বিরুদ্ধে ছিল এবং ওহুদ যুদ্ধে যেই লোকটা লিডার ছিল, তার নাম ছিল আবু সুফিয়ান। এই আবু সুফিয়ানের কাফেলা—আবু সুফিয়ান নিজে সহ এরা সবাই রোমে আসছে ব্যবসা করার জন্য।

রোমের বাদশা এই পুরা কাফেলাকে ধরে নিয়ে আসতে বলছে। তখন পুরা কাফেলাকে ধরে নিয়ে আসা হলো। নিয়ে আসার পরে জিজ্ঞেস করছে, "তোমরা কি তোমাদের নেতা মোহাম্মদকে দেখছো?"

সবাই বলা শুরু করছে, "হ্যাঁ, আমরা তো দেখছি, আমরা চিনি। আমাদের সাথে উঠাবসা করছে, ছোট থেকে বড় হয়েছে।"

তখন হিরাকল বাদশা বলল যে, "এতজনের কথাবার্তা আমি শুনতে পারব না। একজনকে ইমাম বানাও, আমি তার কথা শুনব। একজনকে নেতা বানাও, সে যা বলবে বাকি সবার পক্ষ থেকে তা কথা হবে।"

এখন কে ইমাম হবে, কে নেতা হবে? তখন সবাই মিলে নির্বাচন করল আবু সুফিয়ান নেতা হইতে পারে। আবু সুফিয়ানকে সামনে নিয়ে আসল।

তখন বাদশা হিরাকল সর্বপ্রথম প্রশ্ন করল, "যেই লোক নবুয়ত দাবি করছে, তোমরা কি তার উপর ঈমান আনছো?"

বলল, "না, না! আমরা তার উপর ঈমান আনব, তার কথাবার্তা শুনব—এটা তো সম্ভবই না! আমরা নিজেরাই অনেক ভালো বুঝি।"

—"আচ্ছা ঠিক আছে, সে তো তোমাদের মধ্যে বড় হয়েছে। তার বংশ কেমন? (فَكَيْفَ نَسَبُهُ فِيكُمْ)"

—"তার বংশ অনেক ভালো। সে ভালো, তার বাবা ভালো, তার দাদা ভালো, তার উপর দিকে যারা ছিল সবাই ভালো মানুষ ছিল।"

—দুই নম্বর প্রশ্ন করল: "সে যেই দাওয়াত দিচ্ছে, এ দাওয়াত কি তার আগে অন্য কেউ দিয়েছে? (فَهَلْ قَالَ هَذَا الْقَوْلَ مِنْكُمْ أَحَدٌ قَطُّ قَبْلَهُ)"

—"না, আমাদের দেখা মতে এর আগে আর কেউ দেয় নাই।"

—তিন নম্বর প্রশ্ন করল: "তার গুষ্টির মধ্যে কেউ রাজা-বাদশা ছিল? (فَهَلْ كَانَ مِنْ آبَائِهِ مِنْ مَلِكٍ)"

—"না, কোনো রাজা-বাদশা ছিল না। সবার মতোই সাধারণ মানুষ ছিল।"

—চার নম্বরে জিজ্ঞেস করল: "সে ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত পেয়েছে, আজকে তার বয়স ৫৮ বা ৫৯ বছর। এত লম্বা সময়ের মধ্যে কারা তাকে খেদমত করে, কারা তার কথা মানে? সে যেটা বলে সেটাই সাথে সাথে মেনে নেয়, তার কথা অনুযায়ী সাথে সাথে জীবনকে কোরবান করে দেয়—এরকম লোক কারা? (أَأَشْرَافُ النَّاسِ يَتَّبِعُونَهُ أَمْ ضُعَفَاؤُهُمْ)"

—তখন আবু সুফিয়ান তো কাফের, সে জবাব দিছে, "আমাদের সমাজের মধ্যে কিছু লোক আছে যাদের কোনো টাকা-পয়সা নাই, হতদরিদ্র, জামা-কাপড় কেনার মতো কোনো পয়সা নাই; এই সমস্ত লোক যারা আছে, এরাই মূলত এর পিছে পিছে বেশি ঘুরে। কিন্তু আমরা যারা সম্ভ্রান্ত আছি, আমরা যারা এই যে ব্যবসার কাফেলা নিয়ে আসছি, আমাদের মধ্যে যারা ধনী মানুষ আছে, যারা অনেক টাকা-পয়সার মালিক, তারা তার কথার মধ্যে বেশি একটা কান দেয় না।"

—হিরাকল আবার প্রশ্ন করল: "দিন দিন কি তার দলের লোক আরো বাড়তেছে, নাকি আরো কমতেছে? (أَيَزِيدُونَ أَمْ يَنْقُصُونَ)"

—"যতই মানুষদেরকে নিষেধ করা হয় যে এখানে যাইও না, ততই দেখি ওই গরীব শ্রেণীর মানুষরা তারা সবাই দিন দিন তার উপরে আরো বেশি ঈমান আনতেছে, তার কথাবার্তা আরো বেশি মানতেছে, তার কথাগুলোকে আরো বেশি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতেছে।"

—ছয় নম্বরে প্রশ্ন করল: "সে কি তোমাদের সাথে মিথ্যা কথা বলে? (فَهَلْ كُنْتُمْ تَتَّهِمُونَهُ بِالْكَذِبِ قَبْلَ أَنْ يَقُولَ مَا قَالَ)"

—এবার আবু সুফিয়ান কি জবাব দিবে? আবু সুফিয়ান চিন্তা করতেছে, আমি যদি বলি মিথ্যা কথা বলে, তাহলে আমার পিছনে যারা আমার লোকেরা আছে, এরা সাথে সাথে জবাব দিবে—না, আমাদের ইমাম ভুল করছে! ইমাম ভুল করলে মুসল্লিরা লোকমা দেয় না? তো পিছন থেকে তো তার পিছনে যারা আছে তারা তো লোকমা দিবে—না, না, আমরা মোহাম্মদকে কোনোদিন মিথ্যা বলতে শুনি নাই! এখন আবু সুফিয়ান বলে, "না, উনি কোনোদিন মিথ্যা কথা বলে নাই।"

—পরে জিজ্ঞেস করে হিরাকল: "উনি কি কোনোদিন ওয়াদা খেলাফি করছে? (فَهَلْ يَغْدِرُ)"

—তখন আবু সুফিয়ান বলে, "না, উনাকে কোনোদিন ওয়াদা খেলাফিও করতে দেখি নাই। তবে বর্তমানে তার সাথে আমার একটা চুক্তি চলতেছে, মক্কা থেকে মদিনায় একটা চুক্তি চলতেছে; জানা নাই সে চুক্তি সে রক্ষা করে কিনা।" এই একটা খোঁচা দিয়ে দিল! (এই হাদিসটা বয়ান করছে হযরত আবু সুফিয়ান নিজে মুসলমান হওয়ার পরে। আবু সুফিয়ান নিজে এ ঘটনা বর্ণনা করছেন মুসলমান হওয়ার পরে যে, আমি একটা খোঁচা দিয়ে দিছিলাম আমাদের নবীজির বিরুদ্ধে।)

—তখন হিরাকল বাদশা প্রশ্ন করল: "আচ্ছা, সে তোমাদের সাথে মিথ্যা কথাও বলে নাই, সে তোমাদের সাথে ওয়াদা খেলাফিও করে নাই; তোমাদের সাথে তার কোনো যুদ্ধ হইছে? (فَهَلْ قَاتَلْتُمُوهُ)"

—"হ্যাঁ, যুদ্ধ হইছে।"

—"যুদ্ধে কে জিতছে?"

—"যুদ্ধে বেশিরভাগ সেই জিতছে, তবে মাঝে মধ্যে তাকে হারিয়ে দিয়েছি আমরা।"

—হিরাকল বাদশা পরে আবার প্রশ্ন করল: "সে তোমাদেরকে কি আদেশ করে? (مَاذَا يَأْمُرُكُمْ)"

—তখন আবু সুফিয়ান বলল, "সে আমাদেরকে মূলত চার-পাঁচটা কথা বেশি বলে:

১. তোমরা একমাত্র আল্লাহরই এবাদত করো;

২. তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে কোনোভাবে শিরিক করো না—সেজদা দিয়েও শিরিক করো না, বিশ্বাসের দিক থেকেও শিরিক করো না, কোনোভাবে শিরিক করো না;

৩. তোমাদের বাপ-দাদারা যেই কথাগুলো তোমাদের জন্য বলে গেছে, সেই কথাগুলো যদি আল্লাহ এবং তার রাসূলের কথাবার্তার সাথে মিলে তাহলে তোমরা মানো, আর যদি আল্লাহ এবং তার রাসূলের কথাবার্তার সাথে না মিলে তাহলে বাপ-দাদার কথাবার্তাকে ছেড়ে দাও;

৪. সে আমাদেরকে আদেশ করে আমরা যেন নামাজ পড়ি, আমাদেরকে আদেশ করে আমরা যেন গরীবদেরকে টাকা-পয়সা দেই, সে আমাদেরকে আদেশ করে আমরা যেন সবসময় আমানত রক্ষা করি, আর সে আমাদেরকে আদেশ করে আমরা যেন নিজ বিবি ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্কে না জড়াই—এই সম্পর্কে আদেশ করে।" (ইমাম বুখারী: সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬)।

হিরাকলের মূল্যায়ন ও ঈমানের আলামত

তখন এই হিরাকল তার যে মাঝখানে দোভাষী থাকে (যে তরজমা করে দেয়—তারা তো কথা বলতেছে আরবিতে, আর হিরাকল কথা বলতেছে ইতালির ভাষায়, রোমের ভাষায়), সে তার ওই দোভাষীকে বলতেছে, "দেখো, এতগুলো প্রশ্ন আমি করলাম, এই প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরে আবু সুফিয়ান যে জবাব দিয়েছে, এই জবাবের দ্বারা প্রমাণিত হয় ওই লোকটা বর্তমান যামানার নবী! কারণ নবীদেরকে আল্লাহ তাআলা কোনোদিন খারাপ বংশে পাঠান না, তাদের বংশ অনেক ভালো থাকে। নবীদের যারা অনুসরণ করে—এই সলিড কথার যারা অনুসরণ করে, এরা সাধারণত সম্ভ্রান্ত বা সমাজের মধ্যে টাকা-পয়সা অথবা অনেক পদ-পদবীওয়ালা যারা আছে, এরা সাধারণত নবীদের কথা সহজে মানতে পারে না। যারা দুর্বল মানুষ আছে, আল্লাহ এদের নসিবে হেদায়েতের কথা বেশি লিখে রাখেন।"

বর্তমান সমাজের বাস্তবতা

আজকে মাঝে মধ্যে চিন্তা করলে এই হাদিস আমাদেরও মনে পড়ে যায়! মসজিদের মধ্যে যদি ৫০০ জন মুসল্লি থাকে, এর মধ্যে ৪০০ বা ৪৫০ লোক থাকে এরকম যারা দিনমজুর। মাত্র ২০, ৩০ জন, ৫০ জন আল্লাহর বাছাইকৃত বান্দা থাকে যারা একটু মোটামুটি সচ্ছল আছে, টাকা-পয়সা আছে, বংশমর্যাদা ভালো—তারা মসজিদে আসতে পারে। অথচ ইচ্ছা করলে তৌফিক অনুযায়ী ৪০০ জন যদি গরিব মানুষ থাকে, তাহলে ৮০০ জন বড়লোক আসা দরকার ছিল, তাই না? গরীব মানুষরা নিজেদের কাজকারবার ফেলে দিয়ে তারা মসজিদে চলে আসে, নামাজের সময় আসলেই আযান হলেই তারা মসজিদে চলে আসে। বড়লোক মানুষদের তো অত ব্যস্ততা নাই, গরীবদের যে ব্যস্ততা! ইচ্ছা করলেই তারা নিজেদের অফিসটা বন্ধ করে, রুমটাকে বন্ধ করে মসজিদে চলে আসতে পারে, কিন্তু আসতে পারে না। মসজিদে আসতে পারে না, ওলামায়ে কেরামের বয়ান শুনতে পারে না, কুরআন-হাদিসের কথাগুলো তারা মানতে পারে না।

হিরাকল বাদশা ওই সময় বলে ফেলল যে, নবীর কথা, কুরআনের কথা, হাদিসের কথা তারাই মানতে পারে যারা দুর্বল বান্দা হয়।

দরিদ্ররাই আগে জান্নাতী হবে

আমাদের নবীজি এক হাদিসের মধ্যে বলেছেন, যেই মানুষদেরকে আল্লাহ তাআলা টাকা-পয়সা কম দিয়েছেন, আর যেই মানুষদেরকে আল্লাহ টাকা-পয়সা বেশি দিয়েছেন, উভয় মানুষই নেক আমল করলে জান্নাতে চলে যাবে; কিন্তু যাদের টাকা-পয়সা কম দিয়েছেন, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ধনীদের চাইতে ৫০০ বছর আগে জান্নাত দান করবেন! ৫০০ বছর আগে! এ কথাটা কেন বললেন নবীজি? নবীজি বললেন, ধনী মানুষদের টাকা কীভাবে আসলো, কীভাবে ব্যয় হলো আর কীভাবে থাকলো—এই হিসাব তাদের দিতে দিতে আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক সময় চলে যাবে। বহু মানুষ এমন আছেন যারা টাকা ইনকাম করেন অবৈধ পন্থায়, টাকা ব্যয়ও করেন অবৈধ পন্থায়; মাঝখানে যে ব্যাংকে টাকাগুলো জমা রাখেন, ওই জমা রাখাটাও অবৈধ পন্থা! সুদের কারবারের মাধ্যমে ইনকাম করে, দেখা যায় আরেকজনের সাথে বদ আচরণ করে, খারাপ আচরণ করে, আবার ব্যয়ও করে খারাপ জায়গায়।

তিরমিযীর এক ঐতিহাসিক হাদীস

আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কাল কেয়ামতের ময়দানে আমার একটা সিংহাসন হবে। তিরমিজী শরীফের হাদিস—৩৬২৮ নম্বর হাদিস সম্ভবত, সেই হাদিসের মধ্যে আছে—আমাদের নবীজি বলেন: কেয়ামতের দিন আমার একটা সিংহাসন হবে, সেই সিংহাসনের মধ্যে আমি যখন বসব, তখন সব জান্নাতিরা আমার কাছাকাছি বসার জন্য, আমার পায়ের কাছে বসার জন্য, আমার চেয়ারের কাছে বসার জন্য ভিড় করবে এবং সব জান্নাতিরা আমার চেয়ারের কাছে বসে যাবে। তবে একদম চেয়ারের কাছে যেই জান্নাতিরা বসতে পারবে, আমার পায়ের কাছে যারা বসতে পারবে—তারা হলো ওই মানুষরা, যারা দুর্বল মানুষদের সাথে ভালো আচরণ করে দুনিয়াতে। যার আখলাক আর চরিত্র, যার মেজাজের মধ্যে নম্রতা আছে, সেই মানুষগুলোই মূলত আমার চেয়ারে আমার কাছাকাছি বসতে পারবে। সব জান্নাতিরা আমার কাছাকাছি বসতে পারবে না; জান্নাতিরা জান্নাতে থাকবে সবাই, কিন্তু মজলিসে আমার কাছাকাছি বসবে তারাই, যাদের আখলাক-চরিত্র অনেক সুন্দর হবে।

নবীজি বলেন, আর আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে—আমার কাছাকাছিও থাকবে না, আমার ধারের কাছেও থাকবে না, অনেক দূরে থাকবে—কারা? ‘আস-সারসারূনা ওয়াল মুতাসাদ দিকূনা ওয়াল মুতাফাইহিকূনা’—যারা অধিক কথাবার্তা বলে মানুষদেরকে কষ্ট দিত, যারা অধিক খারাপ আচরণ করে মানুষদেরকে কষ্ট দিত, তারা কেয়ামতের দিন আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে। যারা মানুষদের উপরে অনেক কঠোর আচরণ করত, এরা আমাদের থেকে অনেক দূরে থাকবে।

সাহাবায়ে কেরাম বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! সারসারূন—যারা বেশি সরসর করে বেশি কথা বলে, আর মুতাসাদ দিকূন—যারা বেশি কঠোর আচরণ করে, এ দুইটা তো বুঝলাম; কিন্তু মুতাফাইহিকূন এরা কারা? এটা তো বুঝতে পারলাম না!"

তখন আমাদের নবীজি বললেন: “আল-মুতাকাব্বিরূন”—যারা মনে করে যে আমি সবার চাইতে বড় আর বাকি সবাই আমার চাইতে ছোট, এরাই হলো মুতাফাইহিকূন! এরা আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে, এরা কাছেধারেও থাকবে না, এরা আমার ধারের কাছেও থাকবে না, অনেক দূরে থাকবে (জামে আত-তিরমিযী: ২০১৮)।

সাধারণত যারা সারসারূন হবে, যারা এরকম কথাবার্তা বেশি বলবে, নিজেকে বড় মনে করবে, এরা সাধারণত কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারে না। নামাজের জন্যই আসতে পারে না, তেলাওয়াতের জন্য বসতে পারে না, জিকিরের জন্য বসতে পারে না। কেন? কারণ তার মনের ওই অহংকার তাকে বাধা দেয়।

কাফেরদের যবানে নবীজির পবিত্রতার সাক্ষ্য

তখন হিরাকল বলল, "দেখো, একটা মানুষকে ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত এতগুলা মানুষ দেখেছে। আমি সবার সামনে জিজ্ঞেস করলাম যে, এই মানুষ কি মিথ্যা কথা বলেছে? এরা সবাই মিলে এ কথা কেউ বলতে পারল না যে, এই মানুষ কোনোদিন মিথ্যা কথা বলেছে! চিন্তা করো, আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, এই মানুষ কি কোনোদিন ওয়াদা খেলাফি করেছে? এরা কেউ বলতে পারল না যে কোনোদিন ওয়াদা খেলাফি করেছে। এই মানুষ সারাজীবন ওয়াদা অনুযায়ী আমল করে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, যুদ্ধ তোমাদের মধ্যে কেমন থাকে? তখন ইচ্ছা করলে এমন হইতে পারত যে ওই মানুষ সবসময় জিতে—তা হলো না; আবার এমনও হতে পারত ওই মানুষ সবসময় হারে—তাও হলো না। মাঝখানে বেশিরভাগ জিতে, মাঝেমধ্যে হেরে যায়। তার মানে মুসলমান যারা হবে, আল্লাহর খাস বান্দা যারা হবে, তাদেরকে আল্লাহ সবসময় বিজয় দান করবেন, মাঝে মধ্যে তাদেরকে বিপদেও ফেলবেন, বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি দিবেন, বিভিন্ন ধরনের বিপদের মধ্যে ফেলবেন। কেন? যাতে করে ওই বান্দা আল্লাহর কথা স্মরণ করে, ওই বান্দা যেন আল্লাহকে ভুলে না যায়। সবসময় যদি জিততে থাকে, সবসময় যদি তার বিজয় হতে থাকে, তাহলে তো একসময় সে নিজেকে বড় মনে করবে যে, আমাদের চাইতে বড় আর কে আছে! এজন্য ওহুদের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে পরাজয় করিয়েছেন কেন? যে, আল্লাহর সাহায্য যদি না আসে, তাহলে তোমরা নিজেরা কোনোদিন জিততে পারবা না—এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য।"

নবীজীর চিঠি ও আবু সুফিয়ানের মন্তব্য

তখন হিরাকল বাদশা ওই সময় দরজা লাগাইলো। দরজা লাগিয়ে সব মানুষদেরকে বলল যে, "দেখো, আমি বুঝে ফেলছি! আমি বুঝে ফেলছি—এই লোকটাই সত্য নবী! তো আমি এখন ঈমান আনতে চাচ্ছি, আমি এখন ঈমান আনতে চাচ্ছি। এই যে দিহ্‌ইয়া সাহাবী সেই লোকটা আমার কাছে যেই চিঠিটা পাঠাইছে, আমার কাছে যে চিঠি নিয়ে আসছে, এই চিঠির মধ্যে লেখা:

مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ: سَلاَمٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلاَمِ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ ... يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَنلا نَعْبُدَ إِلاَّ اللَّهَ ...

অর্থ কি? অর্থ হলো: মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে হিরাকেলের কাছে আমি একটা চিঠি পাঠাইলাম। আপনি যদি মুসলমান হয়ে যান, তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে দুনিয়াতেও শান্তি দান করবেন, আখেরাতেও শান্তি দান করবেন।"

তো উনি বলেন যে, "এই চিঠি অনুযায়ী আমি মুসলমান হতে চাচ্ছি, তোমরা সবাই মিলে কি বলো?"

তখন ওই রুমের মধ্যে যত উজিররা ছিল, এই পরিমাণ চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিল! বলল, "এক চিঠি পেয়েছেন আর আরেক দল পেয়েছেন, এই দলরা কিছু কথাবার্তা বলল—এই কারণে আপনি মুসলমান হয়ে যাবেন? আপনার কি জ্ঞান-বুদ্ধি মাথায় কিছু নাই?" এই পরিমাণ চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল!

হিরাকল বাদশা বলল যে, "আমি আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না, আমি পরে জানাব যে মুসলমান হব কিনা।"

আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে বললেন, "তোমরা বাইরে বের হয়ে যাও।"

এরা সবাই বাইরে বের হয়ে গিয়ে এরা নিজেরা বলতেছে, “لَقَدْ أَمِرَ أَمْرُ ابْنِ أَبِي كَبْشَةَ”—কিরে ব্যাপার কি! আমরা তো ওই লোকটারে মক্কা থেকে মদিনায় তাড়িয়ে দিয়েছি। তাড়িয়ে দেওয়ার পরে ছয়-সাত বছর পার হয়ে গেছে, সেই ছাগলের দল—শব্দ কি? ছাগলের দল! আমাদের নবীজি ছাগল চড়াইতেন না? তো এই কারণে আবু সুফিয়ান বলল, ওই ছাগলের দলের দাওয়াত দেখা যায় এই বাদশার কাছে পৌঁছে গেছে! আর এই বাদশা দেখা যায় সেই ছাগলের দলে যোগদান করার জন্য মুসলমান হয়ে যাচ্ছে! ব্যাপারটা কি?

কি বোঝা যায়? আবু সুফিয়ান ওইদিন যেমন মুসলমানের দাওয়াতকে ছাগলের দল বলেছিল, যারা নামাজ পড়বে, যারা রোজা রাখবে, যারা দ্বীনের সাথে আসবে—তাদেরকে যুগে যুগে ছাগল, পাগল, মৌলবাদী বলা হতে থাকবে! এটা বলা হতে থাকবে, এই বিষয় নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নাই। এই বিষয় যদি শুনি, তাহলে আমরা নিজেরা আরো আমল বাড়িয়ে দেওয়া দরকার, নিজেদের আমলের সাথে আরো অগ্রসর হওয়া দরকার।

রবিউল আউয়াল মাস চলতেছে। এই মাসের মধ্যে আমাদের অন্য যত কাজকারবার হয়, সেই কাজকারবারের দিকে না তাকিয়ে আমাদের নবীজির যেই জীবন—যে সারা জীবনের মধ্যে একটা মিথ্যা কথা নাই, সারা জীবনের মধ্যে একটা ওয়াদা খেলাফি নাই, সারা জীবনের মধ্যে কোনো সময় আল্লাহর উপরে কোনো শেকায়েত নাই—এই জীবন আমাদেরকে ধারণ করা দরকার। এই জীবন আমরা ধারণ না করে আমরা যদি অন্য জীবনের দিকে তাকাই, অন্য জিনিসের দিকে তাকাই, তাহলে এটা আমাদের জন্য বড় নাকামি!

মসজিদুশ সিজদা ও দরূদ শরীফের ফজিলত

সর্বশেষ একটি কথা বলি। এখনো মদিনায় একটা মসজিদ আছে, যেই মসজিদের নাম 'মসজিদুশ সিজদা'। মসজিদের সামনে একটা সাইনবোর্ড লাগানো আছে—মসজিদে নববী থেকে মসজিদে কুবার দিকে যাইতে হাতের বাম পাশে ওই মসজিদটা পড়ে, 'মসজিদে সেজদা'। সেজদার মসজিদ। দোনো নামে এই মসজিদকে নামকরণ করা হয়।

মসজিদের সামনে একটা সাইনবোর্ড লাগানো আছে। সাইনবোর্ডের মধ্যে আরবিতে কিছু কথা লেখা। কি কথা? আরবিতে লেখা আছে যে, এই জায়গায় আসার পরে আমাদের নবীজি একদিন লম্বা সেজদা দিলেন, অনেক লম্বা সেজদা দিলেন! সেজদা এত লম্বা দিয়েছেন যে, অন্য সাহাবায়ে কেরাম যারা সাথে ছিলেন, উনারা আশ্চর্য হয়ে গেলেন যে—কি ব্যাপার! আমাদের নবীজি এই জায়গার মধ্যে এসে এত লম্বা সেজদা দিচ্ছেন, ঘটনা কি? উনারা আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

অনেকক্ষণ সেজদা দেওয়ার পরে আমাদের নবীজি সেজদা থেকে মাথা উঠিয়েছেন। মাথা উঠানোর পরে মুচকি মুচকি হাসতেছেন। হাসার পরে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এভাবে হাসতেছেন কেন?"

নবীজি বললেন, "এইমাত্র জিবরাঈল আমার কাছে আসছে। আসার পরে বলছে—আমার কোনো উম্মত কেয়ামত পর্যন্ত যদি কোনো সময় আমার উপরে একবার দরুদ পাঠায়, আল্লাহ তাআলা আমার ওই উম্মতের ১০টা গুনাহ মাফ করে দিবেন, ১০ বার রহমত নাযিল করবেন, জান্নাতে তাকে ১০টা দরজা বুলন্দ করে দিবেন। সুবহানাল্লাহ! আমি এজন্য খুশি হয়ে গেলাম—আমার উপরে দরুদ পড়ার কারণে আমার উম্মতের উপরে এতগুলো গুনাহ মাফ হবে!" (মুসনাদে আহমাদ: ১৬৬২১, সুনানে নাসায়ী: ১২৯৭)।

‘صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا’—একবার মাত্র একবার দরুদ পড়লে যদি ১০ বার রহমত নাযিল করে, ১০টা গুনাহ মাফ হয় আর ১০টা দরজা বুলন্দ করা হয়, তাহলে যেই উম্মত প্রতিদিন শত শত বার আমার উপরে দরুদ পাঠাইবে, ওই উম্মতের মর্যাদা কত বেশি হবে! ওই উম্মত কত ভালো হবে, ওই উম্মত জান্নাতের মধ্যে কত উপরের তবকায় যাবে!

আমরা তো এই আমল থেকে বড় গাফেল। আমরা কি প্রতিদিন ১০০ বার আমাদের নবীজির উপরে দরুদ পড়ার নিয়ত করতে পারি না? যেই নবীজি এত পাক-পবিত্র জীবনওয়ালা ছিল, আমরা যদি দিনের মধ্যে ১০টা মিনিট বের করতে না পারি যে আমাদের নবীজির উপরে আমরা দরুদ পাঠাব, তাহলে আমরা হতভাগা উম্মত! আমরা হতভাগা উম্মত!

এজন্য আমরা নিয়ত করি—আমরা রবিউল আউয়াল মাস থেকে এই জিনিস শিক্ষা নিব যে, ইনশাআল্লাহ মৃত্যু পর্যন্ত আমরা প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার নবীজির উপরে দরুদ পড়ব। পারব ইনশাআল্লাহ?

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমাদের নবীজির এই আদর্শে আদর্শবান হওয়ার তৌফিক দান করেন এবং দরুদ শরীফ বেশি বেশি পড়ার তৌফিক দান করেন।

وآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

(জুমার বয়ান থেকে সংকলিত)

পূর্ণ বয়ান শুনতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

#মুসলিম বাংলা #নবী-রাসূল