দোকান বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলে এলপিজি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা: জ্বালানিমন্ত্রী
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দোকান বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠকের পর বুধবার সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি এই সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও উপস্থিত ছিলেন।
কমিশন বাড়ানো, গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ সাত দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
ব্রিফিংয়ে ধর্মঘটের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “তারা যদি ধর্মঘট উইথড্র না করে, তাহলে সরকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
“এলপিজি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এ ধরনের পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৫৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে।”
বাজারে গত এক মাস ধরে নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ‘প্রায় এক হাজার টাকা বেশি নেওয়ার’ অভিযোগ তুলে একজন সাংবাদিক জানতে চান, এ বিষয়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে।
জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতার মধ্যে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে এটি সরকারের তৃতীয় বৈঠক। এসব বৈঠকে সরবরাহ ও দামের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে বিইআরসির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপারেটরদের সমস্যাগুলোও আলোচনায় এসেছে।
সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানি করে না জানিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, এর আমদানি ও সরবরাহ বেসরকারি খাতের হাতে। ফলে সরকার চাইলেই পুরো সরবরাহব্যবস্থা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অপারেটরদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। আগামী ৩০ অক্টোবর আবারও তাদের সঙ্গে বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী।
ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের এলপিজির দামের পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা হলেও কলকাতায় তা ৮৩ টাকা।
জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সরকার এলপিজিতে ভর্তুকি দেয়। নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
“বাংলাদেশে এলপিজির জন্য এমন ভর্তুকি ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে এলপিজি উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় বিক্রি হয়। বর্তমান সরকার এ ব্যবস্থা আগের সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ওঠানামা করছে। এ পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।”
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও ধর্মঘটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এলপিজি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এর সরবরাহ বন্ধ করে বাজারে সংকট তৈরি কিংবা কারসাজির চেষ্টা হলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
তার কথায়, “ব্যবসায় লাভ-লোকসান, কমিশন কিংবা অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে। এসব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে ব্যবসায়িক স্বার্থে বাজার পরিস্থিতিকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না।
“কিন্তু বাজার পরিস্থিতিকে কেউ নিজ স্বার্থের জন্য ব্যবহার করবে, এটি সরকার হতে দেবে না এবং এটি বরদাশত করা হবে না।”
এলপিজির সঙ্গে দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা জড়িত মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পরিবেশকদের দাবিদাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আলোচনা করছে। বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবির কারণে সরবরাহ বন্ধ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, “এটাকে উপজীব্য করে দেশকে জিম্মি করার কোনো প্রচেষ্টা সরকার মেনে নেবে না।”
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ কারণেই অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় করা হয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজি আমদানির প্রচলিত উৎসগুলোতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। এ অবস্থায় চলতি সময়ের পাশাপাশি আগামী বছরজুড়ে এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে, তা এখনই প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
এলপিজি বেসরকারি খাতের আমদানি করা পণ্য জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতি মাসে এর দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানির উৎস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহে যেন ঘাটতি না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কবে নাগাদ দাম সহনীয় পর্যায়ে আসবে, জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী নির্দিষ্ট সময় জানাননি। তিনি বলেন, প্রচলিত আমদানির উৎসগুলোতে যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকায় বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। আগামী বছরজুড়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি ঠেকাতে সরকার কাজ করছে।
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। আগের মাসে এর দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।