বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা, বন্ধ বহু সাইট

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 22 অক্টোবর 2026, 08:14 সকাল • 8 বার পঠিত
বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা, বন্ধ বহু সাইট

বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও ডেনমার্কসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিছু ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) ত্রুটি দুটি সংশোধনে পিএইচপির হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তবে এরই মধ্যে এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলার চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত নিরাপত্তাত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

সংস্থাটির আশঙ্কা, দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা সার্ভারের ফাইল সিস্টেম বা ডেটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।

বিভিন্ন দেশে ওয়েবসাইট বন্ধ

নেদারল্যান্ডসে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র, সরকারি পোর্টাল ওভারহেইড.এনএল, রটারডাম বন্দর, দেশটির জাতীয় ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি, কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও হাসপাতালের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে।

ফিনল্যান্ডের সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভালতোরি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি নেটওয়ার্কের ওয়েবসেবা বন্ধ করে দেয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিরাপত্তা হালনাগাদের অপেক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। ডেনমার্কের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কমবিট কয়েকটি সেবা বন্ধ করে দেয়, যার মধ্যে জাতীয় স্কুল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মও রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিলের ওয়েবসাইট এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটরস’ অনুষ্ঠানের কয়েকটি ওয়েবপেজও পাওয়া যায়নি। তবে এসব ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটির সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত হয়নি।

এআইয়ের সহায়তায় শনাক্ত দুর্বলতা

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত করেন। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, দুর্বলতাগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শনাক্তের বাইরে ছিল।

উইজ জানিয়েছে, উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক অ্যাপ্লিকেশনের বিরুদ্ধে কার্যকর হামলার কৌশল তৈরি ও পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ এ ত্রুটির কারণে ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তবে বিবিসি জানিয়েছে, এ পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

ওপেনএআই এক ব্লগ পোস্টে বিষয়টিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যার একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হ্যাকাররা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের পরিবর্তে ইন্টারনেটজুড়ে পিএইচপির দুর্বল সংস্করণ ব্যবহার করা সার্ভার খুঁজে হামলা চালাতে পারে।

ইন্টারনেটের বড় অংশে ঝুঁকির আশঙ্কা

ওয়েবসাইট তৈরিতে পিএইচপি বহুল ব্যবহৃত একটি প্রোগ্রামিং ভাষা। ওয়েব প্রযুক্তিবিষয়ক পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকসের তথ্য অনুযায়ী, যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। পিএইচপির ওপর নির্ভরশীল ওয়ার্ডপ্রেস দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালিত হয়।

ওয়ার্ডপ্রেস ছাড়াও দ্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টার মতো প্ল্যাটফর্মে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। ফলে সরকারি পোর্টাল, সংবাদমাধ্যম, অনলাইন বিপণনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের কাউন্টার থ্রেট ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ বিবিসিকে বলেন, হ্যাকারদের কাছে এ দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, শুধু নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করাই যথেষ্ট নয়; কোনো প্রতিষ্ঠানের কোন কোন ব্যবস্থায় পিএইচপি ব্যবহার হচ্ছে, তা শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেন কেইনেখট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, নিরাপত্তাত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের হামলা শুরু হয়েছে। হামলার নতুন কৌশল সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের ফায়ারওয়ালের সুরক্ষাব্যবস্থা হালনাগাদ করছে। তিনি এটিকে সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা উল্লেখ করে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দেন।

দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের আহ্বান

পিএইচপি কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় এবং বুধবার সেগুলো সংশোধনে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ব্যবহারকারীদের দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র বলেছে, তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা পুরোপুরি সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইইউ) জানিয়েছে, এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই দূর থেকে কোড চালানো সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল বা ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়ার মতো হামলা চালানো হতে পারে।

সিইআরটি-ইইউর সতর্কতা অনুযায়ী, ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিএইচপি ৫ থেকে পরবর্তী সংস্করণগুলোও ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন কোন সংস্করণ আক্রান্ত, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। পিএইচপি ফাউন্ডেশন সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোর জন্য সংশোধনী প্রকাশ করেছে এবং পিএইচপি ৮.১ বা তার আগের সংস্করণ ব্যবহারকারীদের নতুন সংস্করণে উন্নীত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পাশাপাশি সার্ভারে আগে থেকেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার, হোস্টিং পরিষেবা এবং পিএইচপি-নির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থার নিরাপত্তাও নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।