বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

১৪ বছর ভোগান্তির পর বিআরটি প্রকল্পের ইতি, স্টেশন ভেঙে হবে ৬ লেইনের মহাসড়ক

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 21 অক্টোবর 2026, 11:09 দুপুর • 4 বার পঠিত
১৪ বছর ভোগান্তির পর বিআরটি প্রকল্পের ইতি, স্টেশন ভেঙে হবে ৬ লেইনের মহাসড়ক

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

প্রকল্পের আওতায় নির্মিত স্টেশন, লেইন বিভাজকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সরিয়ে এখন সড়কটিকে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেইনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে।

প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। পাঁচ দফা সময় বাড়িয়েও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি।

দ্রুত বাস চলাচলের জন্য নেওয়া প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত চালু না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও জনভোগান্তি পোহাতে হয়েছে ঢাকা-গাজীপুর করিডোর ব্যবহারকারীদের।

প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেইনের উড়ালসড়ক চার লেইনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সেই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন ১৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি শাখা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়।

উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসির কাছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা সারসংক্ষেপে উল্লিখিত চতুর্থ বিকল্পটি অনুমোদন করেছে। এ বিকল্প অনুযায়ী, বিআরটি করিডোরের স্টেশন, লেইন বিভাজকসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে।

সেজন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সওজের অধীনে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতির প্রতিবেদন পাঠানোরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ব্যয়ের হিসাব ও নতুন পরিকল্পনা

নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে বর্তমান প্রকল্পের কোন কোন অবকাঠামো অপসারণ করতে হবে, সেগুলোর অবচয় কত হবে এবং নতুন করে সড়ক উন্নয়নে কত টাকা লাগবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

এ বিষয়ে উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলি, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হকের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।

বুধবার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এর আগে চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।

এগুলো হল–অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিআরটি চালু করা, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট রুটের বাস চালানো, করিডোরটি টোলসড়কে রূপান্তর করা এবং বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণ করা।

সরকার শেষের বিকল্পটিই বেছে নিয়েছে।

এর আগে গত ১৪ জুন বিআরটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি, নকশা ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তার উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানিয়েছিলেন, সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওই বৈঠকে প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

“সভায় বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন। বিশেষ করে বিআরটির নকশা, স্টেশন ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবা, পরিচালন কাঠামো এবং সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে তারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন,” বলেছিলেন শিপলু।

১৪ বছরের প্রকল্প, বাড়তি ব্যয় ও জনভোগান্তি

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেইনে দ্রুত বাস চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে যানজট এড়িয়ে যাত্রীদের দ্রুত ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল।

চার বছর মেয়াদি বিআরটি প্রকল্প ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কের এই প্রকল্পের সময়সীমা পাঁচ দফা বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি।

এই সময়ে প্রকল্পের আওতায় বিআরটি লেইন, স্টেশন, উড়ালসড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার স্থাপনা স্থানান্তর এবং নির্মাণকাজের নানা জটিলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি বারবার ব্যাহত হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময়।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় বিশেষায়িত বাসসেবা চালুর পরিকল্পনাও পূর্ণতা পায়নি। বাস কেনার দরপত্র প্রক্রিয়াও সফল হয়নি।

এ প্রকল্পের গাজীপুর অংশ চালু না হওয়ায় উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আরেকটি বিআরটি করিডোর নির্মাণের পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত এগোয়নি।

২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই করিডোরে সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়। পরে বিআরটি লেইনও সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে বিশেষায়িত বিআরটি বাসসেবা চালু হয়নি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার অতিরিক্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজন বিবেচনায় বিআরটি সেবা চালু না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা নকশাগত ত্রুটি ও পরিচালনাগত জটিলতার কথা তুলে ধরে বিআরটি বাতিল করে করিডোরটি সাধারণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার সুপারিশ করেন।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকায় প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

চলতি মাসে সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় একটি ফুটব্রিজের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার পাশাপাশি সেখানে স্থাপিত চলন্ত সিঁড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া ও চুরির অভিযোগ পাওয়া যায় স্থানীয়দের কাছ থেকে। এখন প্রকল্পটি বাতিলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ঢাকা-গাজীপুর করিডোরে বিশেষায়িত বাসসেবা চালুর পরিকল্পনার ইতি ঘটল।