ট্রাম্পের শুল্ক: বিশ্ব বাণিজ্যে ‘শতবর্ষে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন’

তাইওয়ানের কিলাং বন্দরে কনটেইনার, ক্রেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর থেকে কী মিত্র, কী প্রতিপক্ষ যাকে ‘বশে আনতে’ চান তার ওপরেই শুল্ক বসিয়েছেন কিংবা বসানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করার লক্ষ্যে এবার তিনি বিশ্বের বাকি সব দেশের ওপরই শুল্ক আরোপ করে বসলেন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে তার বুধবারের এ পদক্ষেপের প্রভাব হবে মারাত্মক, বলছেন বিবিসির অর্থনীতি সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম।
তার মতে, আমদানি পণ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরোপ করা শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রাজস্ব লাফিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যা গত এক শতকে দেখা যায়নি; ছাড়িয়ে যেতে পারে ১৯৩০-র দশকের কঠোর সুরক্ষামূলক বাণিজ্য নীতির সময়ের পর্যায়কেও।
কিংবা রাতারাতি শেয়ার বাজারের পতন দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে এশিয়ায়।
এসবের ফলে যা যা ঘটবে তা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈশ্বিক বাণিজ্যের অলিগলিতে বড় রদবদল নিয়ে আসবে।
সাদামাটাভাবে বললে, ট্রাম্প আদতে যুক্তরাষ্ট্রের সব আমদানি পণ্যে সার্বজনীন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যা এই শুক্রবার রাত থেকে কার্যকর হচ্ছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্ধৃত রয়েছে এমন কয়েক ডজন ‘বাজে অপরাধী’ দেশের ওপর পাল্টা আরও কিছু শুল্ক যুক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে এশীয় দেশগুলোর ওপর যে শুল্ক দেওয়া হয়েছে, তা চোখ ছানাবড়া করে দেওয়ার মতো। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ হাজার হাজার কোম্পানি, কারখানা এবং হয়তো অনেক দেশেরই ব্যবসায়িক মডেল পুরোপুরি গুড়িয়ে দেবে।
মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়বে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অনেক কোম্পানির তৈরি সরবরাহ চেইন। এর অনিবার্য প্রভাব কোম্পানিগুলোকে চীনের দিকে ঠেলে দেবে।
এটা কী কেবলই বৃহৎ দরকষাকষি?
মার্কিন প্রশাসনের কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে, এই শুল্ক রাজস্বের মাধ্যমে তারা আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য আনার দাবি করতে পারে বলেই মনে হচ্ছে।
কিন্তু আরোপিত শুল্ক যে শিগগিরই কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করা হবে, সে সম্ভাবনাও কম।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তার কণ্ঠেও তা দৃঢ়ভাবেই ফুটে উঠেছে।
“এটা দরকষাকষি নয়, এটি জাতীয় জরুরি অবস্থা,” বলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই নীতির মূল লক্ষ্যই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিকে ‘শূন্যে ফিরিয়ে আনা’; যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুরো বদলে যাবে।
ফয়সাল বলছেন, কারখানা স্থানান্তরেই তো কয়েক বছর লেগে যাবে। এদিকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প যেভাবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বসেছেন তাতে খুব দ্রুতই পোশাক, খেলনা ও ইলেকট্রনিক্সের দাম হু হু করে বাড়বে।
ট্রাম্পের এই শুল্কের পাল্টায় বাকি বিশ্ব এখন কী প্রতিক্রিয়া দেখায়- সেটাই প্রশ্ন।
এর মধ্যেই ইউরোপের কিছু ভোক্তার জন্য পোশাক ও ইলেকট্রনিক্সের সস্তা বাণিজ্য থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ যখন অন্তর্মুখী নীতি নিচ্ছে, তখন বাকি বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যকে আরও নিবিড়ভাবে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অবশ্য কেবল সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়াই যে সব নয়, টেসলার বিক্রি কমে যাওয়া থেকেও তা বোঝা যেতে পারে। আজকাল ভোক্তারাও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারেন। যে কারণে ট্রাম্পের পদক্ষেপের প্রভাবে নতুন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া বাণিজ্য যুদ্ধও দেখা যেতে পারে।
ইউরোপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা আর যুক্তরাষ্ট্রে বানানো কোনো কিছু কিনবে না, এর বদলে মনোযোগ ঘুরিয়ে নিতে পারে বিশ্বের অন্যত্র।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় বড় মার্কিন প্রযু্ক্তি কোম্পানিগুলোর যে একচেটিয়া আধিপত্য তা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
শুল্কের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে অনিবার্যভাবেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, তার মোকাবেলায় মার্কিন কর্তৃপক্ষগুলোকেও সুদের হার বাড়াতে হতে পারে।
একটি বিদঘুটে বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবীই মনে হচ্ছে, বলছেন ফয়সাল।