বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, আশ্বিন ৪ ১৪৩১, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৬

আন্তর্জাতিক

হিজবুল্লাহর ‘৫০০০ পেজারে বিস্ফোরক বসিয়েছিল’ ইসরায়েল

 প্রকাশিত: ১৩:৪৪, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪

হিজবুল্লাহর ‘৫০০০ পেজারে বিস্ফোরক বসিয়েছিল’ ইসরায়েল

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর আমদানি করা পাঁচ হাজার পেজারে বিস্ফোরক স্থাপন করে রেখেছিল বলে লেবাননি নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা ও অন্য কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবারের বিস্ফোরণের কয়েক মাস আগেই এসব বিস্ফোরক স্থাপন করেছিল মোসাদ।

এদিন লেবাননজুড়ে কয়েক হাজার পেজারে বিস্ফোরণ ঘটে নয়জন নিহত ও আরও প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হন। এ ঘটনায় হিজবুল্লাহর দুই সদস্য নিহত ও বহু আহত হন। আহতদের মধ্যে বৈরুতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতও আছেন।

এ বিস্ফোরণকে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

লেবাননের ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেজারগুলো তাইওয়ানভিত্তিক কোম্পানি গোল্ড অ্যাপোলো থেকে এসেছে; কিন্তু এক বিবৃতিতে ওই কোম্পানি জানিয়েছে, তারা এসব ডিভাইস তৈরি করে না। তারা জানিয়েছে, বিএসি নামের একটি কোম্পানি এসব পেজার তৈরি করে যাদের গোল্ড অ্যাপোলোর ব্রান্ড ব্যবহার করার লাইসেন্স আছে; কিন্তু তারা বিস্তারিত আর কিছু জানায়নি।

হিজবুল্লাহ এসব বিস্ফোরণের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে এর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

বুধবার এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে, “অন্যান্য দিনের মতো তারা আজও (বুধবার) গাজা, গাজার জনগণ ও তাদের প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন জানিয়ে অভিযান চালিয়ে যাবে। তবে এটি মঙ্গলবারের হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধী শত্রু (ইসরায়েল) যে কঠোর শাস্তির অপেক্ষায় আছে তার থেকে পৃথক একটি পথ।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, পেজার বিস্ফোরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক মাস লেগেছে বলে মনে হচ্ছে।

লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীর ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গোল্ড অ্যাপোলো থেকে পাঁচ হাজার পেজারের ক্রয়াদেশ দিয়েছিল হিজবুল্লাহ। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথমদিকে এসব পেজারের চালান লেবাননে প্রবেশ করেছিল।

গোল্ড অ্যাপোলোর প্রতিষ্ঠাতা সু চিং কুয়াং জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে যে পেজারগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো ইউরোপের এক কোম্পানির তৈরি যাদের গোল্ড অ্যাপোলোর ব্রান্ড নাম ব্যবহার করার বৈধ অনুমতি আছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ইউরোপের ওই কোম্পানির নাম নিশ্চিত করতে পারেননি।

গোল্ড অ্যাপোলো এক বিবৃতিতে ওই কোম্পানির নাম বিএসি বলে জানিয়েছে, কিন্তু সু এই কোম্পানিটি কোথায় অবস্থিত তা জানাতে রাজি হননি।

বুধবার তাইওয়ানের নিউ তাইপে শহরে গোল্ড অ্যাপোলোর দপ্তরে সাংবাদিকদের সু বলেন, “এই পণ্যগুলো আমাদের নয়। শুধু এই পণ্যগুলোতে আমাদের ব্রান্ডের নাম আছে “

লেবাননের ওই ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এপি৯২৪ মডেলের পেজারের একটি ছবি শনাক্ত করেন, এটিও অন্য পেজারগুলোর মতোই তারবিহীনভাবে ক্ষুদে বার্তা রিসিভ ও প্রদর্শন করে কিন্তু ফোন কল করতে পারে না।

গোল্ড অ্যাপোলো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এআর-৯২৪ মডেলের উৎপাদন ও এগুলো বিক্রি করেছে বিএসি।

বিবৃতিতে তারা বলেছে, “আমরা শুধু ব্রান্ড ট্রেডমার্ক ব্যবহার করার অনুমোদন দিয়েছি, কিন্তু এই পণ্যের নকশা বা তৈরিতে কোনোভাবে জড়িত নই।”

ইসরায়েলি লোকেশন-ট্র্যাকিং এড়ানোর জন্য হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যোগাযোগের জন্য নিম্ন প্রযুক্তির পেজার ব্যবহার করে, গোষ্ঠীটির কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত এমন কয়েকজন কর্মকর্তা চলতি বছর রয়টার্সকে এমনটি জানিয়েছিলেন।

ওই ঊর্ধ্বতন লেবাননি কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘উৎপাদনের পর্যায়ে’ ওই ডিভাইসগুলিতে বিস্ফোরক স্থাপন করেছিল।

তিনি বলেন, “মোসাদ ওই ডিভাইসের মধ্যে বিস্ফোরক উপাদান ভরা একটি বোর্ড ঢুকিয়ে দিয়েছিল যেটিতে একটি কোড ছিল। কোনোভাবে এটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন ছিল। কোনো স্ক্যানার বা ডিভাইস ব্যবহার করেও তা সম্ভব ছিল না।”

তিনি জানান, তিন হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয় সেগুলোতে একটি কোড বার্তা পাঠানোর পর আর সেটি একসঙ্গে সব বিস্ফোরককে সক্রিয় করে তোলে।

আরেকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, নতুন পেজারগুলোতে সর্বোচ্চ তিন গ্রামের মতো বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখা হয়েছিল আর কয়েকমাস ধরে হিজবুল্লাহ সেগুলো ‘শনাক্ত করতে পারে নাই’।

সু জানান, পেজার বিস্ফোরণ ঘটাতে জালিয়াতি করা হতে পারে তা তার জানা ছিল না।

এ বিষয়ে রয়টার্সের জানানো মন্তব্যের অনুরোধ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া পেজারগুলোর ছবি রয়টার্স বিশ্লেষণ করে দেখেছে। দেখা গেছে, সেগুলোর পেছনে একটি ফর্ম্যাট ও স্টিকার লাগানো আছে যেটি গোল্ড অ্যাপোলোর বানানো পেজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।