শনিবার ০৫ এপ্রিল ২০২৫, চৈত্র ২২ ১৪৩১, ০৬ শাওয়াল ১৪৪৬

অর্থনীতি

কাকে কতটা ভোগাবে ট্রাম্পের শুল্ক?

 প্রকাশিত: ০৯:৪২, ৫ এপ্রিল ২০২৫

কাকে কতটা ভোগাবে ট্রাম্পের শুল্ক?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের বাণিজ্য অংশীদারদের উপর ব্যাপক মাত্রায় যে ‘সম্পূরক শুল্ক’ আরোপ করেছেন, তার সদূর প্রসারী প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

আল জাজিরা লিখেছে, বেশিরভাগ দেশের পণ্যের ওপর বসানো হয়েছে অন্তত ১০ শতাংশ শুল্ক। আর যেসব দেশ মার্কিন পণ্যের ক্ষেত্রে বেশি শুল্ক আদায় করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, সেসব দেশের ক্ষেত্রে চাপানো হয়েছে বড় অংকের শুল্ক হার।

এই শুল্ক ঘোষণা করে বিশ্ব বাজারকে রীতিমত ঝাঁকিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্ব নেতারা তার সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে, যা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুল্ক বাতিলের জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ বিজয়ী হয় না এবং সংরক্ষণবাদের জন্য কোনো পথ খোলা নেই।”

১০ শতাংশ ফ্ল্যাট শুল্ক ৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে, আর অন্যান্য শুল্ক কার্যকর হবে ৯ এপ্রিল থেকে।

নতুন শুল্কে কী ঘোষণা এসেছে?

ট্রাম্প প্রায় ৬০টি দেশের ওপর সুনির্দিষ্ট ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বসিয়েছেন। এই দেশগুলো মার্কিন পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে থাকে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য।

এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের ওপর যেমন বসেছে, তেমনই কম বাণিজ্য অংশীদারের ওপরও বসেছে। তাদের মধ্যে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ই রয়েছে।

চীনা পণ্যে ৫৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে আগের ২০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে; লেসোথোর পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে; কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ; আর তার প্রতিবেশী ভিয়েতনামের পণ্যে বসেছে ৪৬ শতাংশ শুল্ক।

ডাচ ব্যাংক আইএনজির বৃহত্তর চীনের প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং আল জাজিরাকে বলেছেন, “যে মাত্রায় শুল্ক বাড়ানো হয়েছে তা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক।

“অনেকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ধারণা করছিলেন। এই ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে সম্ভবত বড় খেলোয়াড়রা কিছু প্রতিশোধের ঝুঁকি নেবে, যদিও ছোট দেশগুলো কম হারের জন্য চেষ্টা ও আলোচনার পথ বেছে নিতে পারে।”

ইইউতেও ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আসা সব পণ্যকে এখন ১০ শতাংশের ভিত্তি শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। এ সর্বনিম্ন স্তরের শুল্ক যাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি দেশ হল যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

কানাডা ও মেক্সিকোতে এখন নতুন করে কোনো শুল্ক বসবে না। ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পরপরই দেশ দুটিতে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেন। তাদের যেসব পণ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেগুলো এই আদেশের বাইরে থাকবে।

কোন দেশগুলো সবচেয়ে কম এবং কোনগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আল জাজিরার সারণিতে উঠে এসেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে কারা?

ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মেক্সিকো প্রায় ৫০ হাজার ৫৯০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

এরপরই রয়েছে চীন, যারা রপ্তানি করেছে ৪৩৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার; কানাডার পরিমাণ ৪১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার; জার্মানি ১৬০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার; আর জাপান রপ্তানি করে ১৪৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

 

ইনফোগ্রাফ: আল জাজিরা

ইনফোগ্রাফ: আল জাজিরা

কারা এখন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

যদিও কানাডা বা মেক্সিকোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেননি ট্রাম্প, তবে এই দেশ ‍দুটিই মার্কিন শুল্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। কারণ তাদের রপ্তানির বেশির ভাগের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

জাতিসংঘের কমট্রেডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কানাডার মোট রপ্তানির ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। আর মেক্সিকোর ক্ষেত্রে এই হার ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিপরীতে ইইউর বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র হলেও জোটের অনেক দেশ রয়েছে সেখানকার পণ্য কেনে। কমট্রেডের হিসাবে, ২০২৩ সালে ইইউয়ের মোট রপ্তানির ২০ শতাংশের কম পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছে।

একইভাবে চীনা পণ্যে বড় অংকের শুল্ক প্রয়োগ করা হলেও দেশটির ২০২৩ সালের মোট রপ্তানির মাত্র ১৪ দশমিক ৮ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

সুতরাং ওই বছর চীনের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র হলেও এশিয়ার দেশটির অনেক বিকল্প থাকায় কানাডা বা মেক্সিকোর চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চীনের রপ্তানি গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে- জাপান, জার্মানি, ভারত, মেক্সিকোসহ অন্যান্য দেশ।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের প্রশ্নে চীন কোন পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর মার্কিন শুল্কের প্রভাব নির্ভর করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও চীন বিশেষজ্ঞ চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো কার্লোস লোপেস জানুয়ারিতে আল জাজিরাকে বলেছিলেন, “শুল্ক বৃদ্ধি এবং একতরফা পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর বিদ্যমান অনাস্থাকে আরও গভীর করতে পারে। বাণিজ্য অংশীদারত্বে আরও বৈচিত্র্য আনতে এবং মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীনেরও ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।”

 

ইনফোগ্রাফ: আল জাজিরা

ইনফোগ্রাফ: আল জাজিরা

মার্কিন ভোক্তাদের কীভাবে ভোগাবে?

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা রপ্তানির চেয়ে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি।

বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া সব গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর মার্কিন গ্রাহকরা এরই মধ্যে গাড়ির দাম চড়ে যেতে দেখছেন।

যেহেতু অটো পার্টসের ক্ষেত্রেও শুল্ক বসেছে, সে কারণে আমদানি করা যন্ত্রাংশ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ি ব্যবহারও আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

ডেট্রয়েট রিজিওনাল চেম্বার এবং অটোমোটিভ অ্যান্ড মবিলিটি অ্যাসোসিয়েশন মিচঅটো এক চিঠিতে বলেছে, “বর্ধিত ব্যয় সরবরাহ চেইনে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটাবে এবং সম্ভবত, সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হচ্ছে- যানবাহনের জন্য আমেরিকান ভোক্তাদের উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।”

নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন দেশটির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার বলেন, “এর ফলে মার্কিন ভোক্তাদের চড়া মূল্য গুনতে হবে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, প্রবৃদ্ধি হ্রাস করবে এবং সার্বিকভাবে তা বিশ্বজুড়ে সত্যিকারের চাপ সৃষ্টি করবে।”