‘বিপদ-আপদেরতো ঈদের ছুটি নাই, আমাদেরও তাই’

ঈদের চতুর্থ দিনেও ছুটির আমেজ কাটেনি রাজধানীতে; নগরজুড়ে নেই পরিচিত কোলাহল। বাড়ি যারা যাননি তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে ফিরে কাটাচ্ছেন অবসর।
তবে ছুটি কম হোক বা দীর্ঘ কিছু জরুরি সেবায় কর্মরতদের এমন উৎসবের দিনেও ফুরসত মেলে না। বরং ঈদের মত উৎসবের ছুটিতে সহকর্মী কমে যাওয়ায় তাদের কর্মব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। প্রয়োজনের তাগিদে পরিবারের থেকে দূরে ঈদ করতে হয় তাদের; কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের মধ্যে উদ্যাপন আর দায়িত্ব পালনে কাটে তাদের উৎসবের এ সময়।
ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় শিশু হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসার সদস্য মো. মশিদুল হক হাসিমুখেই বলছিলেন, “বিপদ-আপদেরতো ঈদের ছুটি নাই, তাই আমাদেরও ছুটি নাই।”
ঈদ কেমন কাটল জানতে চাইলে প্রথমে হাসিমুখে ছুটি নেই বললেও কথা বাড়াতেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ পায়।
বগুড়ার সোনাতলার বাসিন্দা মশিদুল পাঁচ সন্তানের জনক। ২৩ বছরের চাকরিজীবনে ২৩টা ঈদও কাটাতে পারেনি পরিবারের সঙ্গে। বলেন, “আমাদের জীবনডাই এরকম। ঈদের দিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ডিউটি করছি। নামাজ পড়ছি, তা কেমন ধরেন- এই মুহূর্তে নামাজ শুরু হবে, পোশাকটা চেইঞ্জ কইরা অজু করছি, তারপর নামাজ শেষ আবার পোশাক পইড়া আইসা দাঁড়াইছি।
“এক ঈদে না গেলে পরের ঈদে যাওন যায় এইডা আমাদের নিয়ম। কিন্তু এক ঈদে না গেলেই পরের ঈদে যাওয়াটা কনফার্ম না। এর আগে তিন বছর রাজশাহীর একটা ব্যাংকে ডিউটি করছি, সেই তিন বছরের একটা ঈদও বাড়িতে করতে পারি নাই।”
তিনি বলেন, “বাচ্চারা ঈদের সময় বলতে থাকে আব্বু আসো, আব্বু আসো। তখন তাদেরকে এইটা সেইটা বলে বুঝাই। খারাপতো লাগেই, কিন্তু কিছু করারতো নাই। ধরেন এইখানে আমরা ৪০ জন ডিউটি করি, এখন সবাই যদি ঈদ করতে যাই তাইলে এইখানে কী হবে? এইজন্য দুইভাগে ছুটিতে যাইতে হয়। আমরাতো মনে করেন নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করি।”
ঢাকার পথঘাট ফাঁকা, হাসপাতালগুলোর ভেতরে ঢুকলে সেটি বোঝার উপায় নেই। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতাল) জরুরি বিভাগের ভেতরে ঢুকতেই রোগীর উপচেপড়া ভিড়। ছুটির দিনেও রোগীদের সামলাতে হিমসিম খাওয়া এক চিকিৎসক বললেন, “দেখতেইতো পাচ্ছেন কেমন ঈদ কেটেছে? ঈদের দিনেও আমাদের এভাবেই কেটেছে। কাজ করতে করতে ঈদ কখন গেল টেরই পাইনি। আমাদের পেশাটাই এমন, মেনেই নিয়েছি।”
সহকর্মীকে ছুটিতে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে কোনও ঈদেই ছুটি কাটানো হয়নি শিশু হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট তপন চন্দ্রের।
কোনও ঈদের ছুটিতেই পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি যেতে না পারার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এবার আমার স্কুলের একটা অনুষ্ঠান গেছে সুবর্ণজয়ন্তীর। বন্ধুরা অনেকবার বলেছে, কিন্তু আমি যেতে পারি নাই। আমার এটা ২৪ ঘণ্টার ডিপার্টমেন্ট। এই সময়টাতে আমি সার্ভিস দিব কলিগরাও আশা করেন। সেই দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ লাগে না। আমি জয়েনিংয়ের পর থেকে এই সার্ভিসটা দিয়ে আসছি।”
ঈদের ছুটিতে বাড়ির অন্যরা গেলেও তারা যেতে পারেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “ছুটি কাটাতে পারি না ঠিকই, কিন্তু আফসোস লাগে না, বরং ক্রাইসিস মোমেন্টে আছি এইটা ভেবে ভালো লাগে। পরিবার বাচ্চাদের নিয়ে অন্যসময় বেড়াতে যাই। তাদেরকে বুঝাই এই সময়ে যাওয়ার দরকার নেই।”
ঈদের দিন ডিউটি করে কাটানোর কথা বললেন আদাবর এলাকার একটি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী মো. শরীফ। বলেন, “ঈদের দিন মানুষজন নামাজ পড়তে যাচ্ছে, পরিবার নিয়ে ঘুরতেছে এসব দেখলাম সারাদিন বুথের সামনে বসে বসে। বাড়ির জন্য খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক, কিন্তু কিছু করারতো নেই। চাকরি করি, চাকরির নিয়মটাই এমন, আমাদের ছুটি নাই।”
ফাঁকা ঢাকার সবকিছু স্থবিরতার মধ্যে যাদের দায়িত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় তারা হচ্ছেন পুলিশ সদস্য। নিজ বাসা ছেড়ে যখন ঢাকাবাসী গ্রামের বাড়িতে ঈদ পালন করছেন, তখন নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তৎপরতা বাড়াতে হয় পুলিশ সদস্যদের।
ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় ঢুকে কোনও সেবাপ্রার্থীকে পাওয়া না গেলেও ডিউটি অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে এসআই মো. আবু জাফর সাদিককে। প্রায় সাড়ে চারমাস আগে ঢাকায় বদলি হয়ে আসা এই পুলিশ সদস্য আগে পাবনাতে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া হওয়ায় আগের ঈদগুলোতে ডিউটি থাকলেও সুযোগ করে বাড়ি গিয়ে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করে আসতে পেরেছিলেন। তার মতে এইবারই কোনো প্রিয়জনের সান্নিধ্য ছাড়া সহকর্মীদের সঙ্গেই ঈদ কাটালেন তিনি।
ঈদের দিন পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “ঈদ আর কেমন কাটবে। গত ১৮ তারিখে বাবা মারা গেছে। বাড়ি গেছিলাম, ঈদের ২-৩ দিন আগে আসেছি। ঈদের দিন ডিউটিতেই ব্যস্ত ছিলাম। এবারের প্রথম ঈদের দিন একা একা। এইবার কলিগদের বাইরে কেউ ছিল না। সারাদিন ব্যস্ততাতেই কেটে গেছে।”
ঈদে দায়িত্ব পালন করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ থাকায় খুশি একই থানার ওসি মো. আবদুল কাইয়ূম। তিনি বলেন, “কেমন পরিস্থিতি ছিল সেই সিনিয়ররা পর্যালোচনা করবে। কিন্তু যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সবকিছু মিলিয়ে ভাল কেটেছে এটাই স্বস্তির।”
জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকে, যেখানে ফোন করে মানুষ পুলিশি সেবা, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে থাকেন।
কল করা মাত্রই সাড়া দেওয়া এই সেবার পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার বলেন, “আমাদেরটা ইমার্জেন্সি সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ২৪ ঘণ্টাই আমাদের শিফটি হিসেবে ডিউটি করতে হয়। আমাদের এখানে প্রায় সাড়ে ৪০০ জন কাজ করেন, এরমধ্যে হয়তো মাত্র ২০ ভাগ বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সামনের ঈদে বাকি ২০ ভাগ যাবে। আর ৬০ ভাগের হয়তো দুই-তিনটা ঈদ এখানেই কাজ করতে হবে।”
তার ভাষ্য, “একেবারে যে খারাপ লাগে না, সেটা বললে ভুল হবে। তবে যেহেতু আমরা এই প্রফেশনে এসেছি, মানসিকভাবে মেনে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি, মানিয়ে নিয়েছি। তবে এবার ঈদ নিয়ে আইনশঙ্খলার যে ভয় ছিল, সেটা হয়নি এটাই আমাদের কাছে স্বস্তির।”
একইভাবে মিরপুর ফায়ার স্টেশনের মশিউর রহমানও কর্মস্থলে ঈদ কাটিয়েছেন। তার মনে পরিবারের জন্য খারাপ লাগলেও ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থে’ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে পারায় ‘তৃপ্তিও’ রয়েছে।
ঈদের দিন কেমন কেটেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঈদের দিন কিছু পরিকল্পনা থাকে আমাদের, সীমিত পরিসরে নিজেদের মধ্যেই খাওয়া দাওয়া করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। এবারও তাই হয়েছে।”