আন্দোলনের মধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়লেন কুয়েট উপাচার্য

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাছুদ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে উপাচার্য তার বাসভবন ছেড়ে ঢাকায় রওনা দেন বলে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শাহেদুজ্জামান শেখ।
তবে শাহেদুজ্জামান দাবি করেন, চিকিৎসার জন্য উপাচার্য এক দিন ঢাকায় অবস্থান করবেন।
শাহেদুজ্জামান আরও বলেন, উপাচার্য তাকে জানান, মঙ্গলবার একদল শিক্ষার্থী এসে তাদের ওপর হামলা হয়েছে দাবি করে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করতে বলেন। তবে তার ব্যর্থতার দায় অস্বীকার করলে উপাচার্যের ওপর কিছু শিক্ষার্থী হামলা করেন।
শাহেদুজ্জামান আরো বলেন, উপাচার্য তাকে জানিয়েছেন, এরপর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি ছিলেন। সেই থেকে এখনও তিনি অসুস্থ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকার পথে রওনা হন।
ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে; এতে অর্ধশতাধিক আহত হন।
একপর্যায়ে সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় রেলগেট, তেলিগাতিসহ আশপাশের বিএনপি নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের সঙ্গে এবং সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
রাতে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
সেখানে তারা পাঁচ দফা দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না এবং থাকলে আজীবন বহিষ্কারের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি; মঙ্গলবারের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, বহিষ্কারসহ ব্যবস্থা নেওয়া; ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্যাম্পাসের বাইরে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের রাখা; আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার ব্যয় প্রশাসন থেকে বহন করা এবং ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের পদত্যাগের দাবি উত্থাপন করেন।
বুধবার বেলা একটার মধ্যে দাবি পূরণের সময় বেঁধে দেন তারা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কুয়েটে সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।
বুধবার সকাল থেকে উপাচার্যের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবিতে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুরে প্রশাসনিক, অ্যাকাডেমিকসহ সব ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।
তখন চিকিৎসাকেন্দ্রের দোতলায় ছিলেন উপাচার্য মুহাম্মদ মাছুদ।
বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৯৩তম সভা হয় বলে জানান, সহ উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠকে চিকিৎসাকেন্দ্র থেকেই অনলাইনে যোগ দেন উপাচার্য।
সভায় ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত হয়।
সহ-উপাচার্য বলেন, মঙ্গলবারের ঘটনায় জড়িত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আর জড়িত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করবে। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করবে। ক্যাম্পাস এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে হলগুলো খোলা রাখা হয়েছে। তবে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীকে হল ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে।
সহ-উপাচার্য বলেন, এছাড়া মঙ্গলবার ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম এম এ হাসেমকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে বুধবার রাতে খান জাহান আলী থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানান, খুলনা মহানগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (নর্থ) আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।
তবে তাদের দাবি ‘পুরোপুরি মেনে না নেওয়ায়’ উপাচার্যকে বর্জনের ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি সহ-উপাচার্য ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালককেও বর্জনের ঘোষণা দেন তারা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, উপাচার্যকে বর্জন করায় এই মুহূর্তে তার কাছে আর কোনো দাবি-দাওয়া নেই। তাই তাকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে তারা কোনো অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন না, কারণ তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। প্রশাসনের নীরবতা তাদের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে তাদের ওপর হামলার ঘটনায় উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থানে আছেন শিক্ষার্থীরা।
এ অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় ক্যাম্পাসের ভাস্কর্য দুর্বার বাংলার পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ক্যাম্পাসের ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রীসহ সব রাজনৈতিক সংগঠনকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন।
শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সরকার ছাত্রদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় রয়েছে। তিনদিন পার হয়ে গেলেও সরকারের কোনো উপদেষ্টা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।