স্মৃতির মিনারে শ্রদ্ধার ফুল

কালো পোশাকে শোকের স্মৃতিচিহ্ন, হাতে শ্রদ্ধার ফুল; সারিবদ্ধভাবে খালি পায়ে ধীর গতিতে চলা- ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া সেই সব অকুতোভয় ‘যোদ্ধাদের’ প্রতি শ্রদ্ধাবনত সব মানুষের পথ যেন মিশেছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
একুশের প্রভাতফেরির পথযাত্রায় সবার কণ্ঠে সেই গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…’।
পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধের ৭৩তম বার্ষিকী এবার এমন সময়ে এল, যখন ছাত্র-জনতার আরেক রক্তাক্ত গণ অভ্যুত্থান পেরিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছে।
রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে জুলাই-অগাস্টের গণ অভ্যুত্থানের আবহের মধ্যে বৃহস্পতিবার প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদনে শুরু হয়েছে ভাষা নিয়ে গর্ব আর শোকের এই দিন পালনের কর্মসূচি।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ১০ মিনিটের ব্যবধানে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এর বাইরে কোনো কোনো দেয়ালের উপরে ব্যানার বসানো হয়েছে, যেগুলোয় বিভিন্ন গান ও কবিতার লাইন কিংবা নানা স্লোগানে একুশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাত ১২টা ৪০ মিনিট থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ অন্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন।
তবে রাত ২টা থেকে সকাল সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত কার্যত নিরবই থাকে শহীদ মিনার। সূর্যোদয়ের পর শুরু হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে শহীদ মিনার মুখে নগ্নপদে প্রভাতফেরির যাত্রা।
আর শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের এই পালায় মূলত সকাল ৭টার পর থেকে স্মৃতির মিনারে নামে মানুষের ঢল।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষে লাইন আরও দীর্ঘ হয়। ফুল আর ছোট ছোট পতাকা হাতে লাইন বেঁধে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় সব বয়সের, সব শ্রেণি পেশার মানুষকে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের সন্তানদের নিয়ে শহীদ মিনারে আসেন ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে এবার ভিন্ন এক আবহে জাতি স্মরণ করছে ভাষা শহীদদের।
জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজনে রয়েছে সেই অভ্যুত্থানের ছাপ। প্রতিবছর শহীদ মিনার এলাকার দেয়ালে বিভিন্ন স্লোগান, কবিতা ও গানের লাইন লেখা হলেও এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে গ্রাফিতি।
কোনো কোনো দেয়ালের উপরে ব্যানার বসানো হয়েছে, যেগুলোয় বিভিন্ন গান ও কবিতার লাইন কিংবা নানা স্লোগানে একুশকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির আত্মত্যাগের এ দিন এখন আর বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বাঙালির ভাষার সংগ্রামের একুশ এখন বিশ্বের সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার দিন।
রক্তঝরা সেই দিন
বায়ান্নর সেই রক্তঝরা দিনে ভাষা সংগ্রামীদের মূলত তিনটি স্লোগান ছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই এবং সর্বস্তরে বাংলা চালু কর।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন। সেদিন ডাকা হয় ধর্মঘট। ধর্মঘট প্রতিহত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। সেদিন ১৪৪ ধারা ভেঙে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় বাংলা মায়ের দামাল সন্তানেরা। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চলে।
ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে হত্যার প্রতিবাদে সেদিনেই দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন চট্টগ্রামের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী।
তিনি লিখেছিলেন- ‘যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে/ তাদের জন্য আমি ফাঁসি দাবি করছি/ যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য/ ফাঁসি দাবি করছি।”
এটিই ছিল একুশ নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেলে আহত ছাত্রদের দেখতে গিয়েছিলেন তখনকার ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী। মেডিকেলের বহির্বিভাগে তিনি ভাষা সংগ্রামী রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ দেখতে পান।
সংগ্রামী রফিকের নিথর দেহ দেখে আবদুল গাফফার চৌধুরী লেখেন অমর কবিতা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। প্রথমে আব্দুল লতিফ ও পরে আলতাফ মাহমুদের সুরে সেই কবিতা হয় গান, যা এখন একুশে ফেব্রুয়ারি আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
মায়ের ভাষার সেই আন্দোলনকে দমাতে না পেরে শেষমেষ পিছু টান দেয় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। এরপর বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তারা। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
বাঙালির সেই আত্মত্যাগের দিন এখন শুধু আর বাংলার নয়, প্রতিটি মানুষের মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার দিন। রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর এক ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২১ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ ছুটির দিন। ভাষা শহীদদের স্মরণে এদিন জাতীয় পতাকা থাকবে অর্ধনমিত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠান হবে। জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনেও অনুষ্ঠান হবে।